মস্তিষ্কে টিউমার বোঝার উপায়

প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

অধ্যাপক ডা. মো. তাহমিনুর রহমান সজল

মস্তিষ্কের টিউমার বা ক্যান্সারের উৎপত্তি প্রধানত দুটি উৎস থেকে। একটি হল অন্য কলা বা কোষ থেকে উৎপন্ন ম্যালিগন্যান্ট টিউমার যা মস্তিষ্কে রক্ত সংবহন, লসিকাগ্রন্থি যেমন সিএসএফ-এর সাহায্যে মেটাসটেসিস বা দ্বৈতীয় হিসেবে আসে। দ্বিতীয়টি মস্তিষ্কের বা ব্রেনের প্রাইমারি বা মস্তিষ্কের কোষ কলা থেকে প্রত্যক্ষভাবে তৈরি প্রাথমিক টিউমার। মেটাসটাটিক ব্রেন টিউমার প্রধানত আসে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার থেকে যেমন এর প্রধান উৎস হল ফুসফুসের ক্যান্সার,স্তন বা ব্রেস্ট ক্যান্সার, অন্ত্রের ক্যান্সার, রক্ত ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া। প্রাইমারি ব্রেন টিউমার সাধারণত মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষ কলা থেকে তৈরি হয় এবং এর মধ্যে প্রধান ক্যান্সারগুলো হচ্ছে গাইয়োমা বা এস্ট্রোসাইটোমা, অলিগোডেন্ত্রোগ্লাইয়োমা, মেডুলোব্লাস্টোমা, ইপেনডাইমোমা এবং লিম্ফোমা।

লক্ষণ-

যে কোন ব্রেন টিউমার বা ক্যান্সারের প্রধান লক্ষণ হল মাথাব্যথা। এটা সাধারণত মস্তিষ্কের মধ্যে প্রেসার বাড়ার কারণে হয়ে থাকে যাকে বেশি ইন্ট্রাক্রানিয়াল প্রেসার বলে। এ ব্যথার কারণ হল ট্রাকশান বা নড়াচড়া এবং ব্যথা বহনকারী স্নায়ুর উত্তেজনা। ব্রেন এর কোন স্থানে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়েছে এর সঙ্গে মাথা ব্যথার কোন সম্পর্ক নেই তবে সাধারণত মাথার পেছনে বা অক্সিপিটাল এলাকায় ক্যান্সার বা টিউমার হলে মাথা ব্যথা মাথার পেছন এবং ঘাড়ে অনুভূত হবে।

খিঁচুনি

ব্রেনের টিউমার বা ক্যান্সারের আরেকটি প্রধান লক্ষণ হল খিঁচুনি হওয়া। এ খিঁঁচুনি শরীরজুড়ে বা জেনারালাইজড অথবা স্থানীয় কোন অঙ্গে বা লোকালাইজড হিসেবে প্রকাশ পায়। যদিও খিঁচুনি অন্যান্য রোগ যেমন মৃগী বা ইপিলেপসি, হাইড্রোকেফালাস, রক্তজমা বা অন্য যে কোন কারণে যখন মাথার মধ্যে ইন্ট্রাক্রেনিয়াল প্রেসার বেড়ে গেলে হতে পারে।

ফোকাল ডেফিসিট

খিঁচুনির সঙ্গে ব্রেনের কোন জায়গায় টিউমার বা ক্যান্সার হয়েছে তার লক্ষণ প্রকাশ পাবে। যেমন ব্রেনের ফ্রন্টাল লোব বা সামনের অংশে টিউমার বা ক্যান্সার হলে ব্যক্তিগত, সামাজিক আচরণগত পরিবর্তন, প্যারাইটাল লোবে টিউমার বা ক্যান্সার হলে কথাজড়তা, হিসাবে গরমিল; টেমপোরাল লোবে ক্যান্সার বা টিউমার হলে কানে সমস্যা, গন্ধের সমস্যা পেছনের দিকে বা অক্সিপিটাল লোবে টিউমার বা ক্যান্সার হলে দৃষ্টিশক্তির অসুবিধা হবে।

রোগ নির্ণয়

যত শিগগির সম্ভব নিউরোমেডিসিন বা নিউরোসার্জারির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখিয়ে নিচের রোগ নির্ণয়ক পরীক্ষাগুলো করাতে হবে-

- স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা দেখার জন্য ইলেক্ট্রোএনকেফালোগ্রাফি বা ইইজি।

- স্নায়ুতন্ত্রের পরিবহন ক্ষমতা বা নার্ভ কন্ডাকশান টেস্ট বা ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি

- রেডিওলজি বা ইমেজিং যেমন ব্রেনের সিটিস্ক্যান এবং এমআরআই যে কোন ধরনের ব্রেনের রোগ নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট।

- সিটি গাইডেড এফএনএসি- যে কোন টিউমার বা ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ে অত্যন্ত নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। এর সুবিধা হল রোগীকে অজ্ঞান করতে হয় না এবং একের অধিকবার এই টেস্ট করা যাবে।

- স্টেরিওস্কোপিক বায়োপসি- নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্রেন টিউমার বা ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষ কলার কিছু অংশ কেটে বের করে বিশেষ স্টেইনের মাধ্যমে মাইক্রোসকোপের নিচে পরীক্ষা করা।

- সিএসএফ বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুয়িড পরীক্ষা- লাম্বার পাংচার করে স্নায়ুরস বা সিএসএফ পরীক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পরীক্ষা।

- রক্ত পরীক্ষা কিছু স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য রোগ টিউমার থেকে বা ক্যান্সার থেকে আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় যেমন হাইপথাইরয়েডিজমের জন্য থাইরয়েড ফাংশান টেস্ট, এসএলই সংযুক্ত স্ট্রোক, ভিটামিন বি১২ সংযুক্ত এটাক্সিয়া এবং সিফিলিসের জন্য ভিডিআরএল।

যদিও ব্রেন টিউমার বা ক্যান্সারের লক্ষণগুলো দেরিতে প্রকাশ পায় তথাপি যে কোন ধরনের বেশি ইন্ট্রাক্রানিয়াল প্রেসারের লক্ষণ যেমন মাথাব্যথা, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া, খিঁচুনি, ফোকাল ডিফেক্ট, কথা বলায় জড়তা, হিসাব গরমিল, স্ট্রোক এক বা দুইদিকে অবশ হওয়া, গন্ধ শনাক্ত সমস্যা ইত্যাদি হলে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এর পর উপরে উল্লেখিত পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা যেমন ব্রেন টিউমার অপসারণ, কেমো এবং রেডিওথেরাপি গ্রহণ বিশেষত ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সারের জন্য এসব রোগীর স্বাভাবিক এবং আরামদায়ক জীবন ধারণের জন্য সহায়ক হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে বিশেষত পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি

আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

"