প্রস্টাটাইটিস রোগ

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

ডা. মুহাম্মদ হোসেন

প্রস্টেট ওয়ালনাট আকৃতির ছোট ফাইব্রো মাসকুলার গ্লান্ড যেটা প্রস্রাবের থলির নিচের দিকে তলপেটে অবস্থিত। ইউরেথ্রা বা প্রস্রাবের নালি প্রস্রাবের থলি থেকে যে স্থানে বের হয় এটি সেখানে প্রস্রাবের নালি ঘিরে রাখে। প্রস্টেট গ্রন্থি সারাজীবন বৃদ্ধি পেতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হলে মূত্র নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। প্রস্টেট গ্রন্থিতে সংক্রমণের কারণে প্রদাহ দেখা দিতে পারে। পুরুষের প্রস্টেট গ্লান্ডের প্রদাহ রোগকে প্রস্টাটাইটিস বলা হয়। পুরুষের যৌবনে পদার্পণ থেকে যেকোনো সময় এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ব্যক্তি যাদের প্রস্টেট বড় হওয়াজনিত সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এ রোগ বেশ অসুবিধার সৃষ্টি করে। রোগের ধরন অনুসারে প্রস্টাটাইটিসকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন : একিউট ব্যাকটেরিয়াল প্রস্টাটাইটিস (তীব্র ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রদাহ), ক্রনিক ব্যাকটেরিয়াল প্রস্টাটাইটিস (দীর্ঘমেয়াদি ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রদাহ), নন-ব্যাকটেরিয়াল প্রস্টাটাইটিস (জীবাণুবহির্ভূত প্রদাহ), প্রস্টটোডিনিয়া, একিউট ব্যাকটেরিয়াল প্রস্টাটাইটিসে রোগীর শরীরে ব্যথা বা ম্যাজ ম্যাজভাব, খুব জ্বর আসা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবের জ্বালা যন্ত্রণা, শরীরে মূত্রথলি বরাবর জায়গায় ব্যথা, পায়ুপথ ও মেরুদ-ের সর্বনিম্ন অংশ বরাবর ব্যথা, প্রস্রাবের শেষে ২-১ ফোঁটা রক্ত পড়া প্রভৃতি। বয়স্ক পুরুষ, যাদের প্রস্টেট গ্লান্ড বড় হওয়াজনিত সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এ উপসর্গ ছাড়াও হঠাৎ প্রস্রাব আটকে যেতে পারে। দৈহিক পরীক্ষায় রোগীর মূত্র নির্গমনপথে কোনো সমস্যা আছে কি না দেখা হয়। ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশনে প্রস্টেটে রোগী খুব ব্যথা অনুভব করেন। প্রস্টেটিক স্মিয়ার পরীক্ষা করা যেতে পারে, প্রস্টাটাইটিস রোগের জটিলতা হিসেবে রোগীর টেসিটস বা অ-কোষ ও এর ওপরের অংশে প্রদাহ ছড়াতে পারে, যাকে বলা হয় ইপিডিমোঅরকাইটিস। এ রোগ নির্ণয়ের পর উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রয়োগ করা হয়। মনে রাখতে হবে, রোগের লক্ষণ দূরীভূত হলেও সম্পূর্ণ কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। অন্যথায় আবার রোগ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। রোগীকে প্রচুর পানি খেতে হবে এবং স্ত্রী মেলামেশা না করা বাঞ্ছনীয়। ক্রণিক ব্যাকটেরিয়াল প্রস্টাটাইটিসে দীর্ঘদিন থেকে রোগীর ব্যথা থাকে। সাধারণত এ ব্যথা তলপেটে, টেসটিস বা অ-কোষে, দুই পায়ের মাঝখানে বা কখনো কখনো পেছন দিকে অনুভূত হয়। এ রোগ নির্ণয় করা বেশ কঠিন। কারণ এর উপসর্গগুলো অধিকাংশই প্রস্টেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে না। এ রোগ নির্ণয়ের উল্লেখযোগ্য হলো ট্রান্সরেক্টাল আল্ট্রাসনোগ্রাম, প্রস্রাবের পরীক্ষা ও প্রস্টেটের রসের পরীক্ষা। পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রীর কোনো ধরনের সংক্রমণ আছে কি না পরীক্ষা করা উচিত। এসব রোগীর ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রস্টেট মাংসপেশি শিথিল করে এমন ওষুধ এবং বেদনানাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। নন-ব্যাকটেরিয়াল প্রস্টটাইটিস সাধারণত সি-ট্রাকোমেটিস নামে এক ধরনের অণুজীব দ্বারা সংক্রমণের ফলে হয়। সাধারণত ইরাইথ্রোমাইসিনজাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক ৪ সপ্তাহ প্রয়োগ করা হয়। পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রীকেও পরীক্ষা করে দেখতে হয় কোনো ইনফেকশন আছে কি না। প্রস্টোডাইনিয়া হচ্ছে রোগীর প্রস্টেট গ্রন্থিতে ব্যথা, রোগীর মূত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে না। মনে করা হয়, একটি প্রস্টেট মাংসপেশির স্পাজমের ফল। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা প্রভৃতির কারণে প্রস্টেট স্পাজম হতে পারে। এ ধরনের রোগীর ইউরোডাইনামি স্টাডি করা যেতে পারে। কোনো ধরনের ইউরেথ্রাল অবস্টক্সন ছাড়াই দেখা যায় এদের প্রস্রাবের ধারা কম। চিকিৎসাক্ষেত্রে এদের মেন্টাল সাপোর্ট দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইউরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা

"