পেটের সমস্যা

প্রকাশ | ১২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

অধ্যাপক ডা. বাহার

খাদ্যাভ্যাসের কারণে পশ্চিমাদের চেয়ে আমাদের বাহ্য ত্যাগের অভ্যাস স্বাস্থ্যসম্মত। আমরা প্রচুর ভাত ও আঁশযুক্ত খাবার খাই। তাই প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার খাবেন; এটি উল্লেখ করার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। আমরা সাধারণত দৈনিক দু-একবার বাহ্য ত্যাগ করি। মলে পিচ্ছিলজাতীয় যৎসামান্য আম থাকা যে স্বাভাবিক-এটা অনেকেই মানতে পারেন না। এটাকে ক্রনিক ডিসেন্ট্রি বা আমাশয় ভেবে সুস্থ মানুষও ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য সবার কাছে ধরনা দেন। সপ্তাহে দুই থেকে চারবার পায়খানা হলে তা স্বাভাবিক। এর কম হলে চিকিৎসা নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। পায়খানা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে দুই থেকে চারবার কম-বেশি হলে কিংবা নরম বা শক্ত হলেই ওষুধ খেতে হবে-এটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। পায়খানা করে পেট খালি হয়নি, ওহপড়সঢ়ষবঃব ংবহংব ড়ভ বাধপঁধঃরড়হ এক কোষ্ঠকাঠিন্য ভেবে ল্যাগজেটিভ বা মল নরম করার ওষুধ খেলে লাভ হয় না। খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। অন্ত্রের স্নায়বিক বৈকল্য বা আইবিএস বা কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসায় এর নিরাময় নেই। নির্দিষ্ট মাত্রায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মেট্রোনিডাজল গ্রুপের ওষুধ কিংবা অ্যান্টিবায়োটিকস না খেয়ে দু-এক বেলা, দু-এক দিন, দুই-চারটা ফ্লাজিল-ফিলসেটজাতীয় ওষুধ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কোনো খাবার না খেলে বাহ্য ভালো থাকে, শুধু সেটাই পরিত্যাজ্য। অযথা মাছ, ভাত, গোশত খাওয়া বাদ দিয়ে নিজেকে বঞ্চিত করবেন কেন? দুধের ব্যাপারেও আমাদের ভুল ধারণা আছে। দুধ আদর্শ খাদ্য, তাই দুধ খেতেই হবেÑএটা যেমন ভুল, দুধ খেলেই ডায়রিয়া হয়, এটাও সত্য নয়। দাঁত গজানোর আগে শিশুদের একমাত্র খাদ্য দুধ, তবে বেশি দিন সব খাদ্যপ্রাণ এ দুধ দিতে পারে না। ছয় মাস পর থেকে শিশুকে দুধের সঙ্গে সঙ্গে অন্য পুষ্টিকর খাবার যেমন মাছ, ভাত, ডিম, গোশত দিতে হয়। আবার দাঁত পড়ে যাওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সেও পরিমাণমতো দুধ খেলে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। স্তন্যপায়ী কোনো প্রাণী দাঁত গজানোর পর দুধ পান করে না। তাই বলে প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ, ভালুক, সিংহরা কি দুর্বল? দুধপ্রাপ্ত বয়সে মাছ গোশত ভাত রুটি থেকে কিছুতেই বেশি পুষ্টিকর নয়, দুধ শিশুদের জন্যই আদর্শ খাদ্য।

যদি কখনো আলকাতরার মতো কালো নরম আর আঠালো বাহ্য ত্যাগ করেন; তবে তা আইবিএসের নরম বা কম বাহ্য ত্যাগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণহানিকর। এটা পাকস্থলী কিংবা খাদ্য অন্ত্রের প্রথমভাগে রক্তক্ষরণের কারণে হয়। এটা অনেক বেশি গুরুতর। এমন হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ কিংবা অনেকবার, কঠিন ও সপ্তাহে একবারও বাহ্য না হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কলেরার মতো চাল ধোয়া পানি বা বারবার নরম ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা হলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডায়রিয়া, আম-আমাশয় বা রক্ত-আমাশয় ভিন্ন ভিন্ন রোগের চিকিৎসাও ভিন্ন ভিন্ন। বৃহদান্ত্রে পলিপ বা ক্যানসার গুরুতর অসুখ, এ জন্য অনেক সময় বৃহদান্ত্রে দেখার জন্য কোলনসকোপি করানো আবশ্যক। শক্ত বা কঠিন পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত গুরুতর অসুখ না হলেও অর্শজাতীয় অসুখ হতে পারে। মনে রাখবেন, দৈনিক দু-একবার পায়খানা না হলে ক্ষতি নেই, তবে মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা প্রস্রাব বন্ধ থাকলে বুঝতে হবে প্রাণহরণকারী কিডনি বিকলতা দেখা দিয়েছে। বাহ্য নিয়ে আমরা যথেষ্ট উদ্বেগ বোধ করলেও প্রস্রাবের দিকে লক্ষ রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : লিভার, গ্যাস্ট্রএন্ট্রোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ইউনাইটেড হসপিটাল, ঢাকা

"