বিজয় এসেছে ফিরে

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

একাত্তরের এদিনে টাঙ্গাইলে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় যৌথবাহিনী। দিন-রাত যুদ্ধ শেষে ভোরের দিকে অস্ত্র সংবরণ করে পাকিস্তান সেনারা। ঢাকায় পাকিস্তান সামরিক অবস্থানের অব্যাহত থাকে বিমান হামলা। কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। কারফিউ অব্যাহত থাকে ঢাকায়।

আজ ১২ ডিসেম্বর। একাত্তরের এ রাতে ঢাকা সেনানিবাসে প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী সদর দফতরে ডেকে পাঠান আলবদর ও আলশামস কেন্দ্রীয় অধিনায়কদের। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এক গোপন বৈঠক। ওই বৈঠকে প্রণয়ন হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা। ফরমান আলী তাদের হাতে তুলে দেন বুদ্ধিজীবীসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামের তালিকা। সে রাতেই আলবদর বাহিনী সাংবাদিক নিজামউদ্দিন আহমদ ও আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে তাদের বাসভবন থেকে ধরে নিয়ে যায়। নির্মমভাবে হত্যা করে তাদের।

সকালে নরসিংদীর ওপর পাকিস্তানি দখলের অবসান ঘটে। বিকেলে ভারতের আর একটি ইউনিট (৪ গার্ডস?) ডেমরা ঘাট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এসে হাজির হয়। সূর্যাস্তের আগে জামালপুর ও ময়মনসিংহের দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্যারাস্যুট ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগ দিয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মিত্রবাহিনী টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, কালিয়াকৈর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছত্রীসেনা নামিয়ে রাতে প্রচন্ড আক্রমণ চালায়। সাহায্যে এগিয়ে আসে কাদেরিয়া বাহিনী। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী খানসামা থানা আক্রমণ করে। যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ১৫ জন ও সাত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাদের হাতে এক মেজরসহ পাকবাহিনীর ১৯ জন ধরা পড়ে। তবে দিনাজপুরের বিরল থানার বহলা গ্রামে ঘটে গণহত্যার নৃশংস ঘটনা। এদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর একটি দল প্রবেশ করে ওই গ্রামে। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটার এক পর্যায়ে কাঞ্চন ক্যাম্পের খান সেনারা অনুপ্রবেশ করে ওই গ্রামে। তারা গ্রামবাসীকে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। খান সেনাদের নির্দেশ মতো তল্পিতল্পা নিয়ে গ্রাম ছাড়ার উদ্যোগ নেয় গ্রামবাসী। ঠিক তখনই খান সেনারা মাইকে আবার তাদের এক হওয়ার নির্দেশ দেয়। তখন মাগরিবের নামাজের সময়। অনেকে নামাজের কাতারেও দাঁড়িয়েছেন। তখনই পাকিস্তান বাহিনী ব্রাশফায়ার করে পেছন থেকে। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন ৩৭ জন।

নীলফামারী, গাইবান্ধা, নরসিংদী, সরিষাবাড়ি, ভেড়ামারা ও শ্রীপুর হানাদার মুক্ত হয়। দক্ষিণে ভারতীয় নৌবাহিনী সপ্তম নৌবহরের আসন্ন তৎপরতা সর্ব উপায়ে বিঘিœত করতে চালনা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ছোট-বড় অবশিষ্ট সব জাহাজ ও নৌযান, উপকূলীয় অবকাঠামো, কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রভৃতি ধ্বংস বা অকেজো করে ফেলে। মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দেওয়ায় ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি তার দলের সদস্যদের এবং সমর্থকদের বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনীর পক্ষে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন। মার্কিন প্রশাসনের হুমকির প্রকাশ্য জবাব দান এবং ভারতের জনসাধারণকে আসন্ন বিপদ ও কঠোর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশে দিল্লিতে বিশেষভাবে আয়োজিত এক জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী ‘সম্মুখের অন্ধকার দিন’ ও ‘দীর্ঘতর যুদ্ধের সম্ভাবনা’ সম্পর্কে সতর্ক করেন। সেই সঙ্গে সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক আহ্বানের জবাবে এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘ মহাসচিব উথানকে এক বার্তায় জানান, ভারত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারতীয় সৈন্য স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত আছে, একমাত্র যদি পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় পৌঁছতে সম্মত হয়।

"