ফ্যাক্টর আওয়ামী লীগের লিটা এগিয়ে জাপা, নাজুক বিএনপি

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০

আতাউর রহমান বিপ্লব ও দীপেন রায়, ঠাকুরগাঁও

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ-রাণীশংকৈল) আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুজন এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) ও ওয়ার্কার্স পার্টির একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী নির্বাচনী মাঠে তৎপর হয়ে উঠেছেন। পীরগঞ্জ উপজেলার ১০টি, রাণীশংকৈল উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ও রাণীশংকৈল উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সেলিনা জাহান লিটা, সাবেক এমপি ইমদাদুল হক, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি ও বর্তমান এমপি অধ্যাপক ইয়াসিন আলী, জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দিন এবং জেলা বিএনপির তরুণ নেতা ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে কে কোন দলের মনোনয়ন পাচ্ছেন তা নিয়ে মানুষের মধ্যে তুমুল আলোচনা। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, এ আসনে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিনা জাহান লিটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এমপি মনোনীত হওয়ার পর তার কর্মকান্ড দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনিই পারবেন এ আসনটি পুনরুদ্ধার করতে। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনটি আওয়ামী লীগ তথা নৌকার দখলে থাকলেও অ্যান্টি আওয়ামী লীগের সমর্থনে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইমদাদুল হক পরাজিত হন। আসনটি যায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী হাফিজউদ্দীন আহম্মদের কাছে। তখন থেকে চলছে ভিন্নধারায়। ২০০১ সালের পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান সাবেক এমপি ইমদাদুল হক, জাতীয় পার্টি থেকে হাফিজউদ্দীন আহম্মদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক এমপি শহিদুল্লাহ শহিদ। কিন্তু মহাজোট হওয়ার কারণে সে নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইমদাদুল হককে। তবে হাতুড়ি মার্কা নিয়ে মাঠে থেকে যান শহিদুল্লাহ শহিদ। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে সে নির্বাচনে বিএনপিকে পরাজিত করে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন হাফিজউদ্দীন আহম্মদ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান সাবেক এমপি ইমদাদুল হক, জাতীয় পার্টি থেকে হাফিজউদ্দীন আহম্মদ আর ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বর্তমান এমপি অধ্যাপক ইয়াসিন আলী। এই নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইমদাদুল হককে। আবারও মাঠে থেকে যান হাতুড়ি মার্কা নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির ইয়াসিন আলী। এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় জাতীয় পার্টি তথা মহাজোটের প্রার্থী হাফিজউদ্দীনের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় হাতুড়ি মার্কা। সে সময় হাফিজউদ্দীনের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বনিবনা না হওয়ায় ওয়ার্কার্স পার্টির অধ্যাপক ইয়াসিন আলীকে সমর্থন জানায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ। সাবেক এমপি ইমদাদুল হকের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী ইয়াসিন আলী হাতুড়ি মার্কা নিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। পরাজিত হন জাতীয় পার্টির তথা মহাজোটের হাফিজউদ্দীন আহম্মদ। এর পরপরই ২০১৪ সালে সংরক্ষিত মহিলা আসন-১ এ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রাণীশংকৈল উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য আলী আকবরের মেয়ে মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী সেলিনা জাহান লিটা। এরপর পাল্টাতে থাকে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের নির্বাচনী প্রেক্ষাপট। আসনটি আওয়ামী লীগের তথা নৌকার অনুকূলে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন সেলিনা জাহান লিটা। মহিলা আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যন্ত সুসংগঠিত করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সম্মেলন করে সফলতা পান তিনি। তার হাতেই তৃণমূল পর্যায় থেকে জেলা পর্যায় মহিলা আওয়ামী লীগ সংগঠিত হয়েছে। এই আসনে এবার ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন সেলিনা জাহান লিটা। সংরক্ষিত আসনের এমপি হলেও চষে বেড়িয়েছেন ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা ছাড়াও দিনাজপুরের কিছু অংশ। এলাকার উন্নয়ন করেছেন সমানতালে। সরকারি বরাদ্দ ছাড়াও উন্নয়ন করেছেন নিজ প্রচেষ্টাতেও। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠা করায় সেখানে শতাধিক শিশু এখন লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করছে। এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে পরিচালনা করছেন তিনি। এ ছাড়াও নারীদের কর্মসংস্থানে সেলাইকাজের প্রশিক্ষণসহ কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন সেলিনা জাহান লিটা।

লিটা এমপি বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছি। স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ও নির্দেশ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। এবার এ আসনে নির্বাচন করার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলব।’

অপরদিকে, বর্তমান এমপি অধ্যাপক ইয়াসিন আলী বলেন, ‘হাতুড়ি মার্কা নিয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছি। সবার সঙ্গে আমার একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমি কারো ক্ষতি করিনি। কাজেই ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে এবার আমিই মনোনয়ন পাব বলে আমার বিশ্বাস।’

এদিকে, এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক এমপি হাফিজউদ্দীন। দীর্ঘদিন থেকে মাঠে অবস্থান করছেন বেশ শক্তভাবেই। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ায় নির্বাচনী এলাকায় দলকে গুছিয়ে নিয়েছেন নিজের মতো করে। তৃণমূলে দলে অবস্থান সুসংগঠিত থাকায় এ আসনে সুবিধাজনক অবস্থান তার। ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রেখেছেন তিনি। দিন যতই যাচ্ছে, ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। সাবেক এ সংসদ সদস্য হাফিজউদ্দীন আহম্মদ বলেন, তার আমলে এই এলাকায় যে উন্নয়ন হয়েছে, তা দৃশ্যমান। সে তুলনায় এখন কোনোই উন্নয়ন হয়নি। হয়েছে উন্নয়নের নামে লুটপাট ও নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন। সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ না করায় তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। এ জন্য জাতীয় পার্টির দিকেই তাকিয়ে আছে সবাই।

অপরদিকে, এ আসনে বিগত সময়ে বিএনপি প্রার্থী কখনোই জয়ী হতে পারেননি। এ আসনে ’৯১ সাল থেকে বিএনপির প্রার্থী হন জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। কিন্তু তিনি কখনোই জয়ী হতে পারেননি। প্রথমবার নির্বাচনে ভোট কম পাওয়ায় জামানত বাজেয়াপ্ত হয় তার। তাই একাদশ নির্বাচন সামনে রেখে কৌশলে নির্বাচনী মাঠ চাঙা করতে বেশ তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে বিএনপি প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদ ও সাবেক ছাত্রনেতা ওবায়দুল্লাহ মাসুদসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে। তৃণমূলের বিএনপির কর্মীরা বলছেন, বারবার একজন প্রার্থী দিয়ে হেরে যাওয়ার করণেই হতাশায় ভুগছেন অনেকে। এবারও প্রার্থী নির্বাচনে ভুল হলে আসনটি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। এ আসনে এবারও মনোনয়ন চাইছেন জেলা বিএনপি নেতা ওবায়দুল্লাহ মাসুদ। যিনি তৃণমূল রাজনীতি করে উঠে এসেছেন। যার হাত দিয়ে ছাত্রদল ও যুবদলের উত্থান হয়েছে। শক্ত অবস্থানে এসেছে জেলা ও উপজেলা ছাত্রদল। নিজ হাতেই গড়ে তুলেছেন বিএনপি এই অঙ্গ দুটি সংগঠন। পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকায় তার গ্রামের বাড়ি হওয়ায় এলাকার মানুষের সেবা করছেন বরাবরই। এ ছাড়াও মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার সফল প্রচেষ্টাও রয়েছে। জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ মাসুদ বলেন, নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি। আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি বিএনপি পাবে এটা নিশ্চিত।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘সুসংগঠিত হয়ে আমরা নির্বাচনের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। একাদশ নির্বাচনে জয়লাভের জন্য আমরা আশাবাদী। সাধারণ মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে জয়ী করে এলাকার উন্নয়ন করার সুযোগ করে দেবেন।’

"