বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ

কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে ৮ জনের মৃত্যু

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, আত্রাই, সুরমাসহ কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। ভেসে গেছে অনেকের ঘরবাড়ি-গবাদিপশু। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। নদ-নদীর পানি বেড়ে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি। ভাসছে মানুষ। এমনকি কয়েকটি জেলায় সড়ক যোগাযোগ ও রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। কয়েকটি জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে রয়েছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার বিলীন হয়ে গেছে। তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট। সুনামগঞ্জে তলিয়ে গেছে সাড়ে চার হাজার হেক্টর রোপা আমন জমি। এদিকে কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে বন্যার কারণে ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

কুড়িগ্রাম: গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামে চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম সদরের খামার হলোখানা এলাকার অলিউর রহমানের স্ত্রী জ্যোৎস্না বেগম (২৫) সাপের কামড়ে, পৌরসভার ভেলাকোপা এলাকার দুলু মিয়ার ছেলে বাবু (দেড় বছর) পানিতে ডুবে, ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের প্রাণকৃঞ্চ গ্রামের খাতক মামুদের ছেলে লুৎফর রহমান (৩৫) মাছ মারতে গিয়ে পানিতে ডুবে এবং গোড়কমন্ডল গ্রামের মৃত কাচু মাহমুদের ছেলে হযরত আলী (৫৫) আকস্মিক ঘরে পানি ঢোকায় আতঙ্কে মারা যান। রাজারহাটের ছিনাই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাদেকুল হক নুরু জানান, কালুয়ারচর ওয়াপদা বাঁধ রাতে ভেঙে যাওয়ার সময় রিফাত (১০) ও লোকমানের স্ত্রী (৩২) পানির তোড়ে ভেসে গেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের খোঁজ মেলেনি।

দিনাজপুর: দিনাজপুরে বন্যার পানিতে ডুবে এক নারী ও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে পানিতে ডুবে এদের মৃত্যু হয় বলে জানান পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। এরা হলেন শহরের বালুবাড়ী ঢিবিপাড়া এলাকার এনামুল হকের ছেলে মেহেদী হাসান, মির্জাপুর এলাকার আব্দুল গফফারের ছেলে আবু নাইম ও বিরল উপজেলার মালঝাড় গ্রামে বাবলু রায়ের স্ত্রী দিপালী রায়। বাবলু রায় বলেন, সকালে বাড়ির মালামাল সরাতে গিয়ে পানিতে ডুবে তার স্ত্রী দিপালী মারা গেছেন।

লালমনিরহাট: লালমনিরহাটে ধরলা নদীর বন্যার পানিতে কলার ভেলা ডুবে ৪ জন নিখোঁজ হয়েছে। এদের মধ্যে নাদিম (৪) নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। গতকাল রোববার বিকালে সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের পুর্ব বরুয়া গ্রামে এ দুঘর্টনা ঘটেছে। মৃত নাদিম কুলাঘাট ইউনিয়নের পুর্ব বরুয়া গ্রামের মোজাম উদ্দিন ওরফে রবিউল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুলাঘাট ইউনিয়নের ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে অনেকেই বসত বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছিল। গতকাল বিকালে ওই এলাকার আব্দুল হামিদ ও তার স্ত্রী আছমা বেগম, মোজাম উদ্দিন ওরফে রবিউল ও তার ছেলে নাদিমসহ ৪ জন মিলে একটি কলার ভেলায় করে নিরাপদ স্থানে যাচ্ছিলো। এ সময় ধরলা নদীর পানির প্রচন্ড স্রোতে কলার ভেলা পানিতে ডুবে গেলে ৪ জনেই নিখোঁজ হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় ৩শ গজ দুরে শিশু নাদিমের লাশ উদ্ধার করা হলেও বাকি ৩ জনের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি ।

কুলাঘাট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নিখোঁজ ৪ জনের মধ্যে শিশু নাদিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি তিন জনকে খুঁজতে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগীতা চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে লালমনিরহাট ফায়ার সার্ভিসের একটি দল নিখোঁজ তিনকে উদ্ধারের জন্য উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, চার দিনের টানা বর্ষণে নীলফামারীর সৈয়দপুরের খড়খড়িয়া নদীর বাম তীরে পশ্চিম পাটোয়ারীপাড়া এবং বসুনিয়া এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরেও পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সৈয়দপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম জানান, ভাঙন রোধে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, ৫ উপজেলার তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, সিংঙ্গীমারী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রেললাইনের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ঢাকা-লালমনিরহাট রুটে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ধলাই ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ায় ঢাকার সঙ্গে কুড়িগ্রামের রেল ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পানি বেড়ে কুড়িগ্রামের ৫০টি ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ৪১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সদর, ফুলবাড়ী, রাজারহাট, নাগেশ^রী, ভূরুঙ্গামারী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের চরাঞ্চলের বেশ কিছু ঘরবাড়িতে দ্বিতীয় দফা পানি ঢুকেছে। ধরলার ভাঙনে বাংটুর ঘাট, হেমেরকুঠি, সারোডোব এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ঘাঘট নদীর পানি শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নদ-নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি হু-হু করে বাড়ছে। জেলার পাঁচ উপজেলায় নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেকে বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দিকা জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে জেলা প্রশাসন। ১৭৭টি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গন, সেনুয়া ও শুক নদীসহ আঞ্চলিক নদীগুলোতে রোববার সকাল থেকে পানি বিপৎসীমার ৪০ মিলিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির এ অব্যাহত বৃদ্ধিতে জেলার প্রায় এক হাজার গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলামপুর উপজেলার উলিয়া, পার্থশী, চিনাডুলী, কুলকান্দি, সাপধরী, চুকাইবাড়ি, নোয়ারপাড়া, দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ, চিকাজানী এবং মেলান্দহের মাহমুদপুর ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ১১টি বিদ্যালয়।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ছে মানুষজন; বিশেষ করে উপজেলার শতাধিক গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ এবং তাহিরপুর উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষ। তলিয়ে গেছে সাড়ে চার হাজার হেক্টর রোপা আমন জমি। গতকাল রোববারও জেলার আটটি উপজেলার এক হাজার ২০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো পরীক্ষা হয়নি। একই সঙ্গে জেলার ৩১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামরুজ্জামান বলেন, বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে।

"