সংসদীয় কমিটির সুপারিশ আমলে নেয়নি মন্ত্রণালয়

প্রধান নৌ-প্রকৌশলীর ঘুষ নিয়ে রহস্য দানা বাঁধছে

অধিদফতরজুড়ে অসন্তোষ-আতঙ্ক

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘ঘুষের টাকাসহ’ গ্রেফতার নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এক বছর আগে সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি মন্ত্রণালয়। ওই সময় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান তার পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন বলে এই মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, প্রধান নৌ-প্রকৌশলীকে ঘুষের অভিযোগে গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কর্মরতদের অভিযোগ-কৌশলে নৌ-প্রকৌশলীকে ফাঁসানো হয়েছে; এর থেকে নিরাপদ নন তারাও।

গত ১৭ জুলাই মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে নিজের কার্যালয়ে বসে একটি জাহাজের নকশা অনুমোদনের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় ফখরুলকে আটক করে দুদক। পরে গত ২ আগস্ট তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ফখরুল আটক হওয়ার পর গত ২০ জুলাই সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী গত বৃহস্পতিবার কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। ওই কার্যবিবরণীর অনুলিপি থেকে জানা যায়, বৈঠকে কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত বৈঠকের বরাত দিয়ে বলেন, ফখরুলের বিরুদ্ধে সেই সময় অনিয়মের অভিযোগ আসে। ফখরুলকে সেই সময় বরখাস্তের সুপারিশও করা হয়। কিন্তু সেটি মন্ত্রণালয় আমলে নেয়নি।

২০১৬ সালের ওই বৈঠকে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছিলেন, ‘প্রায় ১০ হাজার জাহাজ সার্ভে করার জন্য মাত্র চারজন সার্ভেয়ার রয়েছে। এখান থেকে যদি আবার তাকে বরখাস্ত করা হয় তাহলে সার্ভে কার্যক্রম কে পরিচালনা করবে?’ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে গত মাসের বৈঠকে সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যদি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো, তাহলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সুনাম এভাবে ক্ষুণœ হতো না।’

ফখরুল ইসলামকে গ্রেফতারের পর দুদকের পক্ষে যে মামলা করা হয়েছে তাতে বলা হয়, নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ফখরুল ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেঙ্গল মেরিন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ২২টি জাহাজের নকশা অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন সময় জাহাজের আকার ভেদে পাঁচ থেকে ১৬ লাখ টাকা করে ঘুষ দাবি করেন। সর্বশেষ ‘এমভি নওফেল লিহান’ নামের একটি জাহাজের নকশা অনুমোদনের জন্য গত বছরের ১৩ এপ্রিল আবেদন করে বেঙ্গল মেরিন। এর জন্য ফখরুল ওই কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ এন এম বদরুল আলমের কাছে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। বদরুল বিষয়টি দুদককে জানালে ১৭ জুলাই ঘুষ লেনদেনের সময় ফখরুলকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।

অন্যদিকে, নৌ অধিদফতরে কর্মরতদের মতে, ঘুষ প্রদানকারী ব্যক্তি এ এন এম বদরুল আলমের বিরুদ্ধে ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স (আইএসও) ১৯৭৬ লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিল নৌপরিবহন অধিদফতর; যার পরিপ্রেক্ষিতে জেল খাটতে হয়েছিল তাকে। আবার ওই ব্যক্তির দেওয়া ঘুষে আটক হলেন নৌপ্রধান প্রকৌশলী। এটা সন্দেহজনক ও রহস্যময়। এ ছাড়া জাহাজের নকশা অনুমোদনে প্রধান নৌ-প্রকৌশলীর একক কোনো ক্ষমতা নেই বলেও জানান অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা। তারা আরো বলেন, প্রতিটি জাহাজের নকশা অনুমোদনে দুটি কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। ফলে একটি জাহাজের নকশা অনুমোদনেই পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের বিষয়টিও সন্দেহজনক বলে জানায় নৌ-অধিদফতরের কর্মকর্তারা। সংস্থাটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় প্রকাশ্যে কিছু বলবেন না তারা। তবে তাদের সন্দেহ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করে সংস্থার ভেতরের দু-একজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় একটি প্রভাবশালী মহল ঘুষ লেনদেন করেছে। তারা এতই শক্তিশালী যে, যে কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রকাশ্য কথা বলবেন তার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, প্রধান নৌ-প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলামের অনুমোদনের ভিত্তিতে বেঙ্গল মেরিন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেসের অথরাইজড পারসন এ এন এম বদরুল আলমের বিরুদ্ধে নৌ আদালতে ২০১৫ সালে দুটি মামলা করেছিল তৎকালীন সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর (বর্তমানে নৌপরিবহন অধিদফতর)। ওই মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নামবিহীন ডকইয়ার্ডে যাত্রীবাহী নৌযান এমভি কর্ণফুলী-১১ নির্মাণ করা হয়। ওই জাহাজের প্যানেল অব সুপারভাইজর ছিলেন বদরুল আলম। পরে তার বিরুদ্ধে আইএসওর ৬০(ক) এর (৪), ৭০(১) ও ৭২ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করা হয়। ওই মামলায় হাজতেও যেতে হয়েছে তাকে। এ ঘটনার সময়ে প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন এ কে এম ফখরুল ইসলাম। পরবর্তীতে ওই বদরুল আলমই এ কে এম ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করে।

ফখরুলের পক্ষে নৌমন্ত্রীর সাফাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালকে বলেন, ‘গত বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। যা বলার বৈঠকে বলেছিলাম। আজকের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।’ জুলাই মাসের ওই বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বেশ উত্তপ্ত হয় বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘ওই সময় কমিটির প্রায় সব সদস্যই সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আগের দুর্নীতির অভিযোগ আমলে না নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করে।’ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে গত বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কমিটির সদস্য নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, তালুকদার আবদুুল খালেক, মো. আবদুুল হাই, মো. হাবিবর রহমান, এম আবদুল লতিফ, রণজিৎ কুমার রায়, মো. আনোয়ারুল আজীম (আনার) ও মমতাজ বেগম অংশ নেন।

"