রায়ের ফায়দা নিতে চায় বিএনপি

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল-বিষয়ক সুপ্রিম কোর্টের রায়কে বিএনপি রাজনৈতিক ‘সুযোগ’ মনে করছে। দলের নেতাদের মতে, এত দিন থেকে বিএনপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যা যা বলে আসছে প্রধান বিচারপতির দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে সেসবই ওঠে এসেছে। আর তাই একটি গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বিএনপির চলমান আন্দোলনে এই ‘রায়’ একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। আর দেশের সাধারণ মানুষও রায় নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সরকার আর যাই বলুক দেশের মানুষের ‘সেন্টিমেন্ট’কে প্রভাবিত করতে পারবে না বলে মানেন তারা।

রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় সরকারের মন্ত্রীরা যে ভাষায় কথা বলছেন তা দেশবাসী সহজভাবে নিচ্ছে না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, ৫ জানুয়ারির মতো একটি নির্বাচন করে এমনিতেই বর্তমান সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তার ওপর হত্যা, ধর্ষণ এবং ৫৭ ধারার অপব্যবহারের ফলে সারা দেশে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে তাতে গেল কয়েক মাসে সরকারের অবস্থা অনেকটাই বেহাল। একটার পর একটা ঘটনায় সরকার ‘উন্নয়নের জয়গান’ তুলে যেভাবে মানুষকে আসল সমস্যা থেকে দূরে রাখার কৌশল নিয়েছে, তা আর ধোপে টিকছে না। পাহাড়ধস, হাওরের বাঁধ ভাঙা, সারা দেশে বন্যাসহ মহানগরীতে জলাবদ্ধতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ৫৭ ধারার সরকারি দলের লোকজনের দেওয়া বেশ কয়েকটি হাস্যকর মামলা এবং সর্বশেষ বগুড়ার তুফান সরকারের অপকর্মে সরকারের উন্নয়ন জয়গান অনেকটা ‘ফ্যাকাসে’ হয়ে গেছে। তার ওপর গত ১ আগস্ট বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার নিয়ে প্রধান বিচারপতির রায়ে যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে, তা সরকারের মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করেন বিএনপর অধিকাংশ নেতা।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, বিএনপি এত দিন ধরে যা বলে আসছে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে তা অনেকটাই ওঠে এসেছে। এ রায় বিএনপির দাবিকে আরো জোরালো করেছে বলে তিনি মনে করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এই শাসকরা এখন দৈত্যে পরিণত হয়েছে। তাদের দায়িত্ব ছিল গণতন্ত্রকে রক্ষা করা, সেই গণতন্ত্রকে রক্ষা না করে তারা মনস্টারে (অপদেবতা) পরিণত হয়েছে, দৈত্যে পরিণত হয়েছে। ধ্বংস করে দিচ্ছে সব কিছু। তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগকে সংবিধানের অভিভাবক বলা হয়। সংবিধানের যেখানে-যেখানে ত্রুটি থাকে অথবা যে আইনগুলো সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়, আপিল বিভাগ সেই বিষয়গুলো নিয়ে মতামত প্রদান করে। সংসদে যে আইনগুলো পাস করা হয়েছে, সংবিধান যে সংশোধন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে ইতোপূর্বেও আপিল বিভাগ তার মতামত প্রদান করেছে। জনগণের যেটা প্রাপ্য, জনগণের যে আশা-আকাক্সক্ষা সেটাই তারা বলেছেন।’

সরকার বিচার বিভাগের ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে কথা বলেছেন এতে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার যে, এই সরকার ‘বিচার বিভাগের প্রতিপক্ষ’ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে।’

রায়ের পর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক বিচারপতি খায়রুল হকের অবস্থানেরও সমালোচনা করেন বিএনপি নেতারা। এক প্রতিক্রিয়ায় এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে অপসারণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ওই রায় নিয়ে মন্ত্রীদের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট শিগগিরই প্রকাশের দাবিতে আগামী রবি, বুধ ও বৃহস্পতিবার তিন দিনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। গতকাল তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তার ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বলেছেন যে, বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার পরে কোনো সরকারি দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয়। তিনি নিজেই নিজের রায় ভঙ্গ করে আজকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন। মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেসব সাংবিধানিক পদ আছে সেগুলোর শপথের কথা বলা আছে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের শপথের কোনো বিধান নেই। চেয়ারম্যান প্রজাতন্ত্রের একজন ‘কর্মচারী মাত্র’। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তার বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, কোড অব কনডাক্ট আছে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে খায়রুল হক সাহেবেরও কোড অব কনডাক্ট আছে। তিনি কোড অব কনডাক্ট অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না, তিনি চাকরির শর্ত ভঙ্গ করেছেন।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও পর্যবেক্ষণে অনেক কথা এসেছে, যা অপ্রয়োজনীয় এবং এটা বিএনপিকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে বলে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট ষোড়শ সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বারবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বিএনপি রায়ের অপব্যাখ্যা করে রাজনীতি করছে, যা দুর্ভাগ্যজনক।

বিষয়টি মানতে নারাজ বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বিএনপি তো রায় নিয়ে রাজনীতি করছে না। বিএনপির কথা হচ্ছে, এত দিন আমরা বলে আসছি বর্তমান সরকার জনগণের ভোটের সরকার নয়। তারা কোনো মেন্ডেট ছাড়া উন্নয়নের নামে বেশ কয়েক বছর থেকে শুধু লুটপাট করছে। বর্তমান সংসদ জনগণের সংসদ নয়। এই কথাগুলো যদি আদালত আগে বলতেন আর আমরা পরে বলতাম; তাহলেই বলা যেত যে আমরা রাজনীতি করছি।’

খাদ্যমন্ত্রীর আন্দোলন হুমকির কথা স্মরণ করে দিয়ে বিএনপির এ নেতা বলেন, বিএনপি নয়, বরং সরকার রায় নিয়ে রাজনীতি করছে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা যেভাবে কথা বলছেন, তাতে তারা আদালত অবমাননা করছেন। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সরকার প্রধান থেকে শুরু করে তাদের লোকজনের বক্তব্যেই ফুটে ওঠে রায় নিয়ে রাজনীতি সরকারই করছে। আমরা যা বলে এসেছি, সেগুলো সঠিক বলেছি আর সেটাই আদালতের পর্যবেক্ষণেও ওঠে এসেছে। রায়ে বিএনপির কথা সত্য প্রমাণিত হওয়ায় চলমান আন্দোলনের পথে এটাকে সুযোগ বলা যায়। এর বাইরে রাজনীতির কিছু নেই।

সেই দিনের সংবাদ সম্মেলনে আবদুল মতিন খসরু বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় নিয়ে কোনো বিতর্ক চলে না, রাজনীতিও চলে না। বিএনপির কয়েকজন নেতা উসকানিমূলক কথা বলছেন, এটা নিয়ে রাজনীতি করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। কারণ তাদের হাতে আর কোনো খেলা নেই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ রায় নিয়ে রাজনীতি করতে চায় না। খসরু আরো বলেন, সুপ্রিম কোর্ট তাদের প্রতিপক্ষ নয়, কিন্তু বিএনপি প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টা করছে। আদালত রাজনীতির ঊর্ধ্বে, শেষ আশ্রয়স্থল। তাই রায় নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়।

"