এক মুঠোফোনের জন্য দুই শিশুকে এমন নির্যাতন!

‘আমাগের আর মাইরেন না আমরা চুরি করি নাই’

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

বাড়ির সামনে বিশাল এক আমগাছ। গাছটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছোট্ট দুটি শিশু। বাঁধা অবস্থায়ই তাদের ওপর চলছে নির্মম লাঠিপেটা। গগনবিদারী চিৎকারের সঙ্গে তাদের মুখে একটাই কথা- ‘আমাগের ছাইড়ি দেন, আমরা মোবাইল চুরি করি নাই।’ চারদিকে উৎসুক জনতার ভিড়। কেউই এগিয়ে আসছে না শিশু দুটিকে উদ্ধারে। তবে নিষ্ঠুরতার কারণে নয়, আসলে কেউ বাধা দিতে সাহস করছে না ভয়ে। কারণ, যারা পেটাচ্ছে, তারা সমাজের প্রভাবশালী। মোবাইল ফোনসেট চুরির অপবাদে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে দুই শিশুকে বেধড়ক পেটানোর ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায়। স্থানীয় এক ব্যক্তি তার মোবাইল ফোনসেটে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ধারণ করে তা ফেসবুকে আপলোড করেন। এর পরপরই তা ভাইরাল হয়ে যায়। এ ঘটনায় কুষ্টিয়াজুড়ে তোলপাড় চলছে।

নির্যাতিত শিশু জুয়েল চরম-লপাড়া গ্রামের সিরাজুলের ছেলে এবং একই এলাকার নিশানের ছেলে আসিফ। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্যাতিত শিশু জুয়েলের বড় ভাই রবজেল খান বাদী হয়ে কুমারখালী থানায় নির্যাতনকারী তানজিল, তার শাশুড়ি রোকেয়া খাতুন এবং মীর আক্কাস ওরফে মিরুকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনার পর ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং দুই শিশুর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চার-পাঁচ দিন আগে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার চরম-লপাড়া এলাকার রূপালী নামে এক নারীর একটি মোবাইল ফোনসেট চুরি হয়। ওই ঘটনায় তারা একই এলাকার ৭ বছর বয়সী এতিম শিশু জুয়েল ও আসিফকে সন্দেহ করে। গত বুধবার বিকেলে একই এলাকার প্রভাবশালী তানজিল এবং মীর আক্কাস ওরফে মিরু তাদের দুইজনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তানজিলের শ্বশুরবাড়ির সামনে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটায়। শিশু দুটি মোবাইল ফোনসেট চুরির কথা যতই অস্বীকার করে, ততই বাড়ে নির্যাতনের মাত্রা। একসময় আসিফ নামক শিশুটির পরিবারের লোকজন দুই হাজার টাকা ‘জরিমানা’ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু আরেক শিশু জুয়েলকে ছাড়াবে কে? সে যে অতিশয় গরিবঘরের এতিম শিশু! তাই এবার দুইজনের মার একা পড়তে থাকে তার ছোট্ট শরীরের ওপর। বেধড়ক মারধরে একসময় জুয়েলের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে সন্ধ্যায় তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক হুসাইন মহম্মদ শিহাব জানান, শিশু জুয়েলের শরীরের কয়েকটি স্থানে রক্ত জমাট বাঁধার চিহ্ন রয়েছে।

এ ব্যাপারে চাপড়া ১ নাম্বার ওয়ার্ডের সদস্য নূর মুহাম্মদ বলেন, ‘নির্যাতনের ভিডিওচিত্র বুধবার রাতেই দেখেছি। এ ব্যাপারে নির্যাতিত ওই শিশুর পরিবারকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’

জুয়েলের বড় ভাই গত বুধবার কুমারখালী থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ এই ঘটনার অন্যতম হোতা ছেঁউড়িয়ার চরম-লপাড়ার তানজিল এবং তার শাশুড়ি রোকেয়া খাতুনকে ওই রাতেই গ্রেফতার করেছে। তবে ধরা পড়েনি এই ঘটনার আরেক হোতা মীর আক্কাস ওরফে মিরু।

এ ব্যাপারে কুমারখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল খালেক বলেন, ‘নির্যাতিত শিশুর পরিবার মামলা করতে চায়নি। আমরা তাদের থানায় ডেকে এনে অভয় দিয়ে মামলাটি করিয়েছি। দুইজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আরেকজনকে ধরতে অভিযান চলছে।’

"