আ’লীগের ‘প্রার্থী’ দুই ডজন, বিএনপির কম

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

লুৎফুল আলম সজল, নড়াইল

সারা দেশের মতো নড়াইল-২ (সদর-লোহাগড়া) আসনেও নির্বাচনী হাওয়া বইছে। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরু হয়ে গেছে নড়াইল-২ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। সরগরম হয়ে উঠতে শুরু করেছে শহর-গ্রামের চায়ের দোকানগুলো। আবার সামাজিক নানা অনুষ্ঠানেও দেখা মিলছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের। অনেকেই দলীয় মনোনয়ন লাভের আশায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে লবিংয়ে।

আগামী নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে নানা জল্পনাকল্পনাও শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের দুই ডজন নেতা এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেদের নাম ঘোষণা এবং জোটের মনোনয়ন বাগাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এত অধিকসংখ্যক সম্ভ¢াব্য প্রার্থী থাকায় যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন জোটকে সমস্যায় পড়তে হবে মনে করছে অভিজ্ঞ মহল।

অন্যদিকে, নির্বাচনী নানা হিসাব-নিকাশের মধ্যেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা। বিএনপি সমর্থিত জোটে প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম থাকায় এই জোট একটু সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তার পরও যোগ্য প্রার্থী বেছে নিতে তাদেরও হিমশিম খেতে হবে।

নড়াইল পৌরসভা ও সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন, লোহাগড়া পৌরসভা এবং এই উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে নড়াইল-২ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন। বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনুদান দিয়ে জানান দিচ্ছেন নিজেদের প্রার্থিতার কথা। দু-একজন নেতা বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ডিজিটাল ব্যানার টানিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। আর দুই জোটের কর্মী-সমর্থকরাও প্রার্থীদের সমর্থনে বিভক্ত হয়ে তৎপর রয়েছেন। জাতীয় পার্টিসহ অন্য দু-একটি দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও কম-বেশি দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে নড়াইল-২ আসনে আগাম নির্বাচনী হাওয়া ক্রমশ জোরদার হয়ে পড়েছে।

নড়াইল সদরসহ এই জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম ঘাঁটি বলে বিবেচিত। বিশেষ করে নড়াইল সদর আসনে ক্ষমতাসীন দলটি বরাবরই ভালো ফল করেছে। ১৯৭০, ’৭৩, ’৯১, ’৯৬, ২০০১ (উপনির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে), ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস কে আবু বাকের এবং সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান বিজয়ী হন।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের দুই ডজন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল পৌরসভার সাবেক মেয়র নিজামউদ্দিন খান নিলু, সহ-সভাপতি এস এম আসিফুর রহমান বাপ্পি, সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ আইয়ুব আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুরুল করিম মুন, কার্যকরী কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ^াস, কার্যকরী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস কে আবু বাকের, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট সিদ্দিক আহম্মেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সাইফ হাফিজুর রহমান খোকন, লোহাগড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শিকদার আ. হান্নান রুনু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শরীফ হুমায়ূন কবির, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট গোলাম নবী, ঢাকাস্থ নড়াইল সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ নেতা লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ হাসান ইকবাল, নড়াইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা হাসানুজ্জামান, ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মো. আমিনুর রহমান হিমু, ব্যবসায়ী বাসুদেব ব্যানার্জী, মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য মুন্সি নজরুল ইসলাম এবং জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য লতিফা পারভীন।

বিএনপি থেকেও কমপক্ষে পাঁচজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। এরা হচ্ছেন- জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের সিকদার, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন সিকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক ও নড়াইল পৌরসভার সাবেক মেয়র জুলফিকার আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আলী হাসান, কার্যকরী সদস্য মেজর (অব.) মঞ্জুরুল ইসলাম প্রিন্স এবং সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম।

অন্যদিকে, বর্তমান এমপি ও নড়াইল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান ছাড়াও ১৪ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, জেলা জাসদের (আম্বিয়া) সভাপতি অ্যাডভোকেট হেমায়েত উল্লাহ হিরু এবং জাসদের (ইনু) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম ও জেলা সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস ছালাম খান।

বিএনপি সমর্থিত ২০ দলীয় জোট থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হচ্ছেন- ২০০১ সালের উপ-নির্বাচনে জয়ী তৎকালীন চারদলীয় জোট এমপি ও বাংলাদেশ গণসেবা আন্দোলনের চেয়ারম্যান মুফতি শহিদুল ইসলাম এবং এনপিপির মহাসচিব ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ।

আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে নড়াইল-১ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলেও নেত্রী (শেখ হাসিনা) মহাজোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় তার নির্বাচন করা হয়নি। সাফল্য ও সততার সঙ্গে জেলা পরিষদ প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। এসব কারণে এবার দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে উপযুক্ত মনে করেন তিনি। তবে মনোনয়ন না পেলেও তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না ।

নিজাম উদ্দিন খান নিলু বলেন, ‘প্রার্থী হিসাবে যারা মাঠে রয়েছেন তাদের সবার চেয়ে আমি বেশি পরীক্ষিত। নেত্রী (শেখ হাসিনা) বিষয়টি জানেন। বিভিন্ন জরিপও আমার পক্ষে। দলীয় মনোনয়ন পেলে ইনশাআল্লাহ জিতবই। তবে দল মূল্যায়ন না করলেও দলের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেবেন তিনি।’

আসিফুর রহমান বাপ্পি বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে তিনি মনোনয়ন পেলেও পরে ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা অনেকের সামনে কথা দিয়ে বলেছিলেন, তাকেই (বাপ্পি) পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন ফিরিয়ে দেওয়া হবে। নেত্রীর প্রতি তার আস্থা আছে। তিনি আশা করেন শেখ হাসিনা তার প্রতিশ্রুতি রাখবেন।

অ্যাডভোকেট সৈয়দ আইয়ুব আলী জানান, এবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নড়াইল থেকে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেলেও ষড়যন্ত্র করে তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। নড়াইলের উন্নয়নে আগামী নির্বাচনে সুযোগ চান তিনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস কে আবু বাকের বলেন, তিনি এমপি থাকাকালে নড়াইল-২ আসনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নকে আরো গতিশীল করতে এবারও দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ^াস বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে প্রার্থী হবেন তিনি।

অ্যাডভোকেট সিদ্দিক আহম্মেদ, মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট সাইফ হাফিজুর রহমান খোকন, শরীফ হুমায়ুন কবির, অ্যাডভোকেট গোলাম নবী এবং লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ হাসান ইকবালসহ অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। প্রত্যেকেই মনোনয়ন পেলে আসনটি আবারও আওয়ামী লীগকে উপহার দিতে পারবেন বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে, বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, তার দল ওয়ার্কার্স পার্টি ও ১৪ দলীয় জোট মনে করলে তিনি প্রার্থী হবেন। তবে দল ও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করবেন না।

অপরদিকে, বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী আবদুল কাদের সিকদার বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হলে এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে গেলে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। আর নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে বিএনপি এ আসনে জিতবে বলে তার বিশ^াস।

জুলফিকার আলী জানান, দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করবেন তিনি। না দিলে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে থাকবেন। অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন সিকদার জানান, বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলের সঙ্গে আছেন তিনি। দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করবেন।

মনিরুল ইসলাম বলেন, রাজপথের সক্রিয় সৈনিক হিসিবে তিনি একাধিকবার জেল খেটেছেন। এখনো তার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে। তার প্রত্যাশা, দলীয় হাইকমান্ড তাকে মূল্যায়ন করবেন। আলী হাসান বলেন, দুঃসময়ে বিএনপির সঙ্গে থেকে দলীয় বিভিন্ন কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সেজন্যই দল তাকে মূল্যায়ন করবে বলে তিনি মনে করছেন।

এ ছাড়া অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টি থেকে দলটির নড়াইল জেলা সভাপতি শরীফ মুনীর হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফিরোজ আলমের নাম শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন থেকে দলের নড়াইল জেলা সভাপতি এস এম নাসিরুদ্দিন এবং সহ-সভাপতি মাওলানা সামসুল হকের মধ্যে যেকোনো একজন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন করবেন।

"