আমদানি ও মজুদ বেড়েছে তবু কমছে না চালের দাম

*ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দায়ী * জেলা থেকে আনতে খরচ বেশি *মিল মালিকরা দা কমিয়েছেন

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

হাসান ইমন

সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাতে ফসলহানি এবং হাওরাঞ্চলে বন্যার পর বেড়ে যাওয়া চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের আমদানির কৌশল কাজে লাগিনি। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুই হাজার কোটি টাকার চাল আমদানি করলেও বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। গরিব মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি চালের দাম। বরং মাঝে দাম কিছুটা কমলেও এখন ফের বাড়তির দিকে। তবে চালকল মালিকরা দাবি করছেন, বস্তাপ্রতি চালের দাম ২০০ টাকার মতো কমেছে (কেজিপ্রতি চার টাকা)। আর রাজধানীর ব্যবসায়ীরা বলছেন, জলাবদ্ধতা ও সড়কে খানাখন্দ তৈরি হওয়ায় জেলাপর্যায় থেকে চাল আনতে খরচ বেশি হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাল ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দাম কমছে না। এর প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।

চালের দাম বাড়লে বরাবর নিম্নআয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর চালের দাম বাড়লে বাড়ে আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রেরও দামও। এ কারণে তাদের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় হয় খাবারের পেছনে। চালের দাম বাড়ার পর বেড়েছে মাছ-মাংসের দামও। বর্ষার কারণে সবজির দামও এখন চড়া। চট্টগ্রামের পাইকারি আড়ত খাতুনগঞ্জে জলাবদ্ধতায় পেঁয়াজের বেশ কিছু চালান নষ্ট হওয়ার পর পেঁয়াজের দাম চড়া। এই অবস্থায় নিম্নআয়ের মানুষ চাল, সবজি, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে।

সরকার আশায় ছিল আমদানি করে পরিস্থিতি মোকাবিলার। আর চালের আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের পর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, কেজিতে ছয় টাকা করে কমবে চালের দাম। কিন্তু তার সেই আশা ফলেনি। গত মাসের মাঝামাঝি অবস্থায় মোটা চাল কেজিকে এক থেকে তিন টাকা কমলেও এখন আবার বাড়তির দিকে। তবে চিকন চালের দাম রয়েছে আগের মতোই। আমদানি শুল্ক কমানোর আগে বাজারে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫০ টাকায় ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২২ জুন ২৮ শতাংশ থেকে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে আনা হয়। এরপর গত মঙ্গলবার আরেক দফা শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে সরকার। এ ছাড়া চালের দাম কমাতে গত ২ আগস্ট ১০ লাখ টন চাল আমদানির জন্য কম্বোডিয়ার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করেছে সরকার। এর আগে ভিয়েতনামের সঙ্গে ১০ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করে। ওই চালের দুটি চালান ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ড ও ভারতের সঙ্গে চাল আমদানি নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। তবে বেসরকারি পর্যায়ে এ দুই দেশ থেকে চাল আমদানি করছে ব্যবসায়ীরা। স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিনই শত শত টন চাল দেশে ঢুকছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন ও জুলাই মাসে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি চাল আমদানির এলসি খোলা হয়। এলসি নিষ্পত্তির পর দুই মাসে দেশে প্রায় দেড় লাখ টন চাল আসে। আমদানি পর্যায়ে রয়েছে আরো অনেক চাল। এদিকে সরকারের গুদামে বাড়ছে চালের মজুদ। গত মাসে সরকারি গুদামে চাল ছিল এক লাখ ৯১ হাজার টন। বর্তমানে তা এসে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার টনে। অর্থাৎ এক মাসে মজুদ বেড়েছে ১৯ হাজার টন। সরকারি-বেসরকারি এত আমদানির পরেও কমছে না চালের দাম। ফের বাড়তির দিকে চালের দাম।

গতকাল বুধবার রাজধানীর চালের বাজারের খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, বিশ দিন আগে চালের দাম কেজিপ্রতি দু-এক টাকা কমলেও এখন আবার বাড়তির দিকে। কেজিপ্রতি এক টাকা করে ফের বেড়েছে। বাজারে মোটা স্বর্ণা চাল প্রতি কেজি ৪৫-৪৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মিনিকেট (ভালো মানের) ৫৪, মিনিকেট (সাধারণ) ৫২, বিআর২৮ ৪৮, সাধারণ মানের নাজিরশাইল ৫০, উন্নতমানের নাজিরশাইল ৫২, পাইজাম চাল ৪৮, বাসমতী ৫৩ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতি বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি এ টি এম আমিনুল ইসলাম বলেন, বগুড়া জেলার আশপাশে জেলাগুলোর পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম কমেছে। এখানে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মিডিয়াতে দেখি ঢাকাতে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬-৪৮ টাকা কেজি। ঢাকার ব্যবসায়ীরা পাইকারি নিলে খরচসহ কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা বাড়বে। এত টাকায় বিক্রি করার তো মানেই হয় না। তার মানে রাজধানীর বাজারে সরকারের যথাযথ মনিটরিং নেই।

মিল মালিকদের এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন রাজধানীর ব্যবসায়ীরা। কারওয়ান বাজার পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মেসার্স মতলব ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী রায়হান জগলু বলেন, ‘মিল মালিকদের থেকে চাল নিয়ে আসতে আমাদের খরচ আগের চেয়ে বেশি পড়ছে।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, সড়কে খানাখন্দে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। এ ছাড়া যানজট তো রয়েছেই। যেখানে আগে একদিনে চালের ট্রাক চলে আসত, সেখানে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগছে। এতে আমাদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

এই বিষয়ে জানতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রোগ্রামে থাকায় কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বলেছেন, চালের কোনো সংকট নেই। দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে চালের দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট।

এদিকে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো সংগ্রহেও আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছে না খাদ্য অধিদফতর। গত ৩ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি গুদামগুলোয় মাত্র এক লাখ ৭৭ হাজার ৭৫১ টন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। ধান সংগ্রহ হয়েছে এক হাজার ৩৬৯ টন। অথচ বোরো মৌসুমে আট লাখ টন চাল ও সাত লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৪ টাকা এবং প্রতি কেজি বোরো চালের সংগ্রহ মূল্য ৩৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে ২ মে, চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। অর্থাৎ অভিযান শেষ হতে বাকি আর মোটে ২৩ দিন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এত অল্প সময়ে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে না। চলতি মৌসুমে কম বোরো সংগ্রহের রেকর্ড সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা।

"