নির্বাচনী আইনে আসছে ব্যাপক সংস্কার

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

বিদ্যমান আইন ও বিধি-বিধানের আলোকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় বিদ্যমান আইনে নিজেদের শক্তিশালী মনে করছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে, ১৯৭২ (আরপিও) বড় ধরনের সংস্কারের লক্ষ্যে খসড়া প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেছে কমিশন।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ইসি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ মে আগামী দেড় বছরের কাজের খসড়া সূচি ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো নুরুল হুদা কমিশন। সেখানেও নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কারের ওপর তাগিদ দিয়ে বলা হয়, কালের পরিক্রমায় ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরো অর্থবহ এবং সহজ করতে আইনি কাঠামোয় কতিপয় যুগোপযোগী ধারণা প্রবর্তন দরকার।

সে ধারণার আলোকে, আরপিওর ২৭টি ধারার ৩৫টি অনুচ্ছেদে সংযোজন-বিয়োজন এবং সংশোধন ও বিলুপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সংযোজন হবে ২১টি, বিয়োজন ৩টি, সংশোধন ৭টি এবং অপ্রয়োজনীয় ৪টি অনুচ্ছেদ বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশ করা প্রস্তাবনার মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান করার নিমিত্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে, ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিলমারা কিংবা কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা বানচালের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোট বাতিলের জন্য রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক সরকারের অধীনে চাকরিরত আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থেকে মুক্ত রাখতে চাকরি থেকে অবসরের পর বর্তমান তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থিতায় অযোগ্য ঘোষণা করা, প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জন্য ব্যালটে ‘না’ ভোটের বিধান প্রবর্তন করা, আচরণবিধি দেখভাল ইসির কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া (বিদ্যমান ম্যাজিস্ট্রেটদের বদলে ইসির কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা), ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী দুজন প্রার্থীর ভোটের ফল সমান হলে বিদ্যমান লটারি প্রথা বাতিল করে পুনঃ ভোটের বিধান যুক্ত করা, স্থানীয় নির্বাচনের মতো সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অনলাইনে জমা দেওয়ার বিধান সংযোজন করা এবং নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা ফেরাতে বিদ্যমান জরিমানা ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে এক লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে আরপিও সংস্কারে যে প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে এটাই প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত। তবে, নির্বাচন আইন সংস্কার কমিটির সমন্বয়ক নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের নেতৃত্বাধীন কমিটি এটি পর্যালোচনা করে শুধু অনুমোদন দেবেন।

প্রস্তাবিত আইন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আরপিওর ৬(এএ) ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, র‌্যাব, আনসার, ব্যাটালিয়ান আনসার, বিজিবি এবং কোস্টগার্ডের পর ‘ডিফেন্স সার্ভিস অব বাংলাদেশ’ শব্দটি সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবর্তনের যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা দেশবাসীর কাছে দৃশ্যমান করার স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা কমিশনের জন্য সহায়ক হবে। আরপিওর ২৬ অনুচ্ছেদে সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের সংজ্ঞা স্পষ্ট করার জন্য। আর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচের বিষয়টি ২৭ অনুচ্ছেদে সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় হলফনামার অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি সংযোজন করতে হয়। পাশাপাশি সার্টিফিকেট না থাকলে মার্কশিট কিংবা প্রশংসাপত্র গ্রহণ করা যেতে পারে এমন প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্রে ‘স্বশিক্ষিত’ লেখেন; কিন্তু এর সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করেন না। আগামীতে কোনো প্রার্থী শিক্ষাগত যোগ্যতার স্থানে ‘স্বশিক্ষিত’ উল্লেখ করলে দালিলিক প্রমাণ দেওয়া বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নির্বাচনে প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের আচরণবিধি প্রতিপালনে জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। এগুলো আগামীতে কমিশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের জন্য (ইসির আইন সেলের মাধ্যমে) ‘ইলেকটরাল ম্যাজিস্ট্রেট’ নাম দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের বদলে ইসির কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা। এর জন্য দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ করানো। এ-সংক্রান্ত বিধানটি আরপিওর ৮৯ ধারায় সংযোজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিসিরা রিটার্নিং অফিসার হবেন যা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাদেরকে এ পদে নিয়োগ করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আরপিওর (৭(১) কোথাও বলা নেই। এবার এ অনুচ্ছেদে সংযোজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা বা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তার ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক প্রার্থী ভোটের পর এ বিষয়ে শৈথিলতা দেখান; এ কারণে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তাই নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের মধ্যে গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য পরবর্তী নির্বাচনের আগে ব্যয়ের হিসাব না দিলে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থিতায় অযোগ্য হবেন-এমন শব্দগুলো অনুচ্ছেদ-১২(৪৪সি) ধারায় সংযোজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা সংক্রান্ত ১২(এফ) ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান এ ধারায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিন বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত স্বতন্ত্র কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল থেকে প্রার্থী হতে পারেন না। এবার আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থেকে আরো দূরে রাখতে তিন বছর থেকে আরো দুই বছর যোগ পাঁচ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অবসর, বাধ্যতামূলক অবসরের সঙ্গে পদত্যাগ করার বিষয়টি সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আরপিওর ১২(৩এ)(এ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্তির অর্থাৎ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়াসংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য স্বাক্ষর দিয়ে অনেক ভোটার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। স্বাক্ষর যাচাই করতে গেলে ভয়ে ও হুমকির মুখে স্বাক্ষর দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। আবার অনেক ভোটার অনৈতিক অর্থ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। ভোটারের অধিকার রক্ষায় বিধানটি বিলুপ্ত করা যৌক্তিক।

এখন মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর দুজন প্রার্থীর মধ্যে একজনের মনোনয়নপত্র অবৈধ হলে অপরজনকে বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থী আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান; পরে এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তাই আগামীতে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণার বিধান অন্তর্ভুক্ত করে ১৯ অনুচ্ছেদটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অনিয়মের কারণে ভোটকেন্দ্র বন্ধে রিটার্নিং অফিসারকে ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ২২(এ) ধারা সংযোজনের সুপারিশ করা হয়েছে। আর ২৫(৫) ধারায় সংযোজনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভোট চলাকালীন বিভিন্ন ঘটনায় প্রিসাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে পারলেও ভোট গ্রহণের আগের রাতে বা অন্য কোনো সময়ে ব্যালট ছিনতাই বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে বা অন্য কোনো কারণে ভোট গ্রহণ বন্ধ করার প্রয়োজন হলে রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোট বাতিলের ক্ষমতা থাকতে হবে।

ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা কিংবা প্রবাসীদের ভোটদানের জন্য বিদ্যমান পোস্টাল ব্যালটের পরিবর্তে ইলেকট্র্রনিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ব্যালট বাক্সে ভোটসংবলিত ব্যালটে পূর্ণ হওয়ার পর লক সিল লাগানোর প্রস্তাব আনতে আইনে সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর অনুচ্ছেদ ৩১(৫)(বিবি) ধারায় ‘না’ ভোটের বিধান সংযোজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে আরপিওর ৩২ অনুচ্ছেদ। এতে বলা হয়েছে, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ণের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘টেন্ডার্ড ভোট’ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। এটি সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা উচিত। ভোটে বাতিল ব্যালটপ্রথা বাতিল করাসংক্রান্ত অনুচ্ছেদটি বিলুপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ফলাফল ঘোষণার আগে বাতিল ব্যালট গণনা করা সম্ভব হয় না। নির্বাচনী অপরাধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জড়িয়ে পড়া রোধ করার জন্য এবং নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি বাড়ানোর জন্য ৪৪ই(৫) অনুচ্ছেদ সংযোজন করা।

তা ছাড়া মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী পরিবেশ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়ম, কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল কর্তৃক বড় ধরনের অনিয়ম বা আচরণবিধি লঙ্ঘন ইত্যাদি সম্পর্কে সরাসরি তদারকি ব্যবস্থা ‘তৃতীয় পক্ষ’ নিয়োগ করা। এতে ইসির মনিটরিং দক্ষতা বাড়বে; এ-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৯১সি(৮) সংযোজন করা। আর আরপিও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে গেজেট প্রকাশ করা।

১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এর আগে বিভিন্ন সময় সংস্কার করা হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরপিওর বেশ কিছু বিধান সংশোধন করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়। এ পর্যন্ত ১১ বার আরপিওতে সংশোধনী আনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে অন্তত ২০৯টি বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) আইন ২০১৩ বিল পাস হয়।

২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরের পর শুরু হবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা।

"