আলোচনায় আবগারি শুল্ক ও ভ্যাট

তোপের মুখে অর্থমন্ত্রী

একগুঁয়েমি বন্ধ করেন, কথা কম বলেন : মুহিতকে সেলিম

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৭, ০০:০০

সংসদ প্রতিবেদক

প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সমালোচনায় মুখর ছিলেন সরকারি দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া ‘বিতর্কিত’ বক্তব্যের জন্য তোপের মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী। তারা বলেছেন, বাজেটে শুল্ক ও ভ্যাট বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর প্রস্তাব জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা। আর আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপনার কিছু কথা বার্তা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। আপনি একগুঁয়েমি বন্ধ করেন, কম কথা বলেন, বয়স হয়ে গেছে, কখন কি বলে ফেলেন তার ঠিক থাকে না।’

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা প্রথম স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন সরকারি দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুবুল আলম হানিফ, আবুল কালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সেক্টর কমান্ডার (অব.) মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, এইচ এন আশিকুর রহমান, ইসরাফিল আলম, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, মো. মাহবুব আলী, মনিরুল ইসলাম, মোসলেম উদ্দিন, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, বিএনএফের এস এম আবুল কালাম আজাদ, স্বতন্ত্র সদস্য মো. মকবুল হোসেন এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নাসরিন জাহান রত্না, বেগম মাহজাবিন মোর্শেদ ও সেলিম উদ্দিন।

আলোচনার শুরুতে অর্থমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত থাকলেও এক পর্যায়ে তাকে আর অধিবেশনে দেখা যায়নি। অর্থমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই অনুপস্থিত থাকায় আলোচনাকালে সংসদ সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম অর্থমন্ত্রীর অতিকথনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জনকল্যাণের জন্য রাজনীতি করে। জনগণের কষ্ট হয় সেটা আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারে না। তাই অর্থমন্ত্রীকে বলব, আবগারি শুল্ক যেটা দিয়েছেন, সেটা প্রত্যাহার করেন। এটা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এই আবগারি শুল্কের জন্য গোটা জাতি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে খারাপ ধারণা নেবে এটা আমরা চাই না।’ অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার কিছু কথা-বার্তা আমাদের সরকারের অনেক সময় বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়। এই সংসদেই একদিন বলেছিলাম আপনি কথা কম বলেন। আপনার বয়স হয়ে গেছে, কখন কি বলে ফেলেন, হুশ থাকে না। এখনই সতর্ক হতে হবে।’ শেখ সেলিম বলেন, ‘একগুঁয়েমি করে সরকারকে আর বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবেন না।...যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন বাজেটে কোনো অসংগতি থাকলে সেটা আমি দেখব। আর আপনি (অর্থমন্ত্রী) সিলেটে গিয়ে বললেন, এক লাখ টাকা যার আছে সে ধনী ও সম্পদশালী! আপনি হলমার্ক কেলেঙ্কারির সময় কি বলেছিলেন? ভুলে গেছেন? তখন বলেছিলেন চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না। আর এখন এক লাখ টাকা বেশি টাকা হয়ে গেল?’

শেখ সেলিম বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। সংসদে ৩৫০ জন সদস্য ঠিক করবে জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। এটা আপনি (অর্থমন্ত্রী) সিদ্ধান্ত নেবেন না। আপনার একগুঁয়েমি বন্ধ করেন। কথা কম বলেন। আপনি আইএমএফের কথা শুনে সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমিয়েছেন। এই আইএমএফ কোনো দিনই ভালো চায় না। তারা একবার বলেছিল কৃষিতে ভর্তুকি না দিতে। সেটা করলে কি হতো?’ ঢালাওভাবে ভ্যাট আরোপের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর টাকা ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। তাদের পরামর্শ মেনে চলা যাবে না। আপনি ভ্যাটের আওতা বাড়ান। সব প্রতিষ্ঠানকে ইসিআর মেশিন দেন। যাতে ভ্যাট দিতে বাধ্য থাকেন। ঢালাওভাবে ভ্যাট বিশ্বে কোথাও নেই।’

বিএনপির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে শেখ সেলিম বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাগরে ডুবে গেছে। এখন বিএনপি নেত্রী চান সহায়ক সরকার। সংবিধানে সহায়ক বলে কোনো কিছু নেই। খালেদা জিয়া যতই হুঙ্কার দেন, সংবিধানের বাইরে নির্বাচন হবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। পাকিস্তান মার্কা বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ শুনে কোনো লাভ হবে না। এদেশে ১৫ ফেব্রুয়ারি কিংবা ফালু মার্কা কোনো নির্বাচন হবে না। খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে আসতে হবে। অন্য কোনো পথ নেই। ড. ইউনূস গংরা কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাস চালালে জনগণ গণপিটুনি দিয়ে দেশ ছাড়া করবে।’

নির্বাচনী বাজেট কবে দেবেন : সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘এইবারের বাজেটটাই আমাদের নির্বাচনী বাজেট হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি জানি না, অর্থমন্ত্রী কি কারণে, কার পরামর্শে এটাকে নির্বাচনী বাজেট না করে, নির্বাচনবিরোধী বাজেটে পরিণত করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘বাজেট পেশ করার পর দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, এই বাজেট নির্বাচনী বাজেট নয়। তাহলে নির্বাচনী বাজেট কবে দেবেন আপনি? আগামী বছর যখন পেশ হবে তখন জুলাই মাস শুরু হয়ে যাবে। এরপর নভেম্বর তফসিল ঘোষণা। তাই সেই বাজেট আমাদের নির্বাচনে কোনো সহায়ক ভূমিকা রাখবে না।’

আবগরি শুল্ক কার স্বার্থে : বেসিক ব্যাংকের জন্য এক হাজার কোটি টাকা মূলধন বরাদ্দের তীব্র সমালোচনা করে মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী এই টাকা কেন দিলেন? কার টাকা দিলেন? যেখানে লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা নয়-ছয় হয়েছে। তাতে ব্যাংকের মূলধনে টান পড়েছে। সেটা নিয়ে তদন্ত না করে উনি নতুন করে মূলধনের টাকা দিলেন। এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী ব্যাংকে জমা রাখা টাকার ওপর আবগরি শুল্ক ধার্য করেছেন কি কারণে? কার স্বার্থে, কার পরামর্শে এটা আমার বোধগম্য নয়। এই আবগরি শুল্ক ধার্য করে কত টাকা রেভিনিউ আসবে? এই আবগরি শুল্কের কারণে মাত্র চার শ কোটি টাকা বৃদ্ধি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, হলমার্কের ঘটনার পর অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন চার হাজার কোটি টাকা এমন কোনো টাকা না। তাই যদি হয় তাহলে কেন এই চার শ কোটি টাকার জন্য সারাদেশের মানুষের মধ্যে আক্ষেপ ক্ষোভ সৃষ্টি করলেন? আমি মনে করি, অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে এটি বাতিল করা।’

জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করেন : বিদ্যামান ব্যবস্থার পরিবর্তন করে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরকে অর্থ বছর হিসেবে চালুর প্রস্তাব করেন মাহবু-উল আলম হানিফ। তিনি পিপি, জিপি ও এপিপি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের বেতন বাড়ানোর দাবি জানান। এক্ষেত্রে পিপি ও জিপিদের বেতন ৩০ হাজার, অতিরিক্ত পিপিদের বেতন ২৫ হাজার এবং এপিপিদের বেতন ২০ হাজার করার প্রস্তাব করেন। আর ইউপি চেয়ারম্যানদের বেতন ১৫ হাজার ও মেম্বর বেতন ১০ হাজার করার পরামর্শ দেন।

এই বাজেট নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে : সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেন, ‘আপনি এক কাপড়ে বিদায় করে দেবেন? মুখে বড় বড় কথা বলে লাভ নেই। আপনারাই তো বিদায় হয়ে গেছেন। জনগণ শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে আছে।’ বাজেটে প্রস্তাবিত কর ও ভ্যাটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই বাজেট নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। তাই ব্যাংক আমানতের ওপর আরোপিত শুল্ক পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ’গ্রামে সীমাহীন লোডশেডিং চলছে উল্লেখ করে তিনি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

সংবাদপত্র শিল্পে করারোপে ক্ষোভ : আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সদস্য নাসরিন জাহান রতœা সংবাদপত্র শিল্পে উচ্চ হারে করারোপে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই করারোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা না হলে সংবাদপত্র শিল্পে অস্থিরতা দেখা দেবে। সংবাদপত্র শিল্প অবাধে কর্মী ছাঁটাইয়ের কবলে পড়বে। তিনি ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার, ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার এবং বিড়ি ও সিগারেটের ওপর সমহারে করারোপের আহ্বান জানান।

কিছু অন্ধকার এখনো আছে : জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, কিছু অন্ধকার এখনো আছে। শত ষড়যন্ত্র, বাধা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা দেশকে কৃষ্ণপক্ষ থেকে শুল্কপক্ষে নিয়ে এসেছেন। মৃত্তিকার কন্যার হাত ধরে আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। অর্থমন্ত্রী এমন প্রকল্প নিয়েছে, ইতিহাস এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। যানজটে ঘণ্টা পর ঘণ্টা চলে যায়, পানিতে রাজধানী ডুবে যায়। মানুষ প্রশ্ন তুলেছে- প্রধান দুই নগরীকেই অর্থমন্ত্রী জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে পারে না। মেগা প্রকল্পের চেয়ে এটাকেই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল।

দুঃসাহসী বাজেট : বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘দুঃসাহসী বাজেট’ উল্লেখ করার পাশাপাশি সোলার প্যানেল, তেল ও এলপিজির ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, ২০১৮ সালের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে হলে আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। আগামী বাংলাদেশ হবে ‘গ্রিন ও অদম্য’ বাংলাদেশ।

এগিয়ে বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, অনেক সূচকেই ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মাত্র আট বছরেই দেশের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। সারাবিশ্বই বাংলাদেশের এমন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রশংসা করছেন।

৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের তাগিদ : সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাজেট পাসে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। চিফ হুইপ যেদিকে হাত নাড়ান, আমরাও সেদিকে নাড়াই। এভাবে বাজেট পাস হলে বাজেট বাস্তবায়ন হবে না।’ তিনি আরো বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে কিছুটা সংশোধন এনে বাজেটে যদি এমপিদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে অর্থমন্ত্রী এভাবে অনড় অবস্থানে থাকতে পারতেন না। তাকে এমপিদের কথা শুনতে হতো।

"