সবচেয়ে সমালোচিত বাজেট

সিপিডির সংলাপে বক্তারা

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন অর্থবছরের (২০১৭-১৮) প্রস্তাবিত বাজেট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট হিসেবে উল্লেখ করলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি দেশের ‘মোস্ট ক্রিটিসাইজড’ (সবচেয়ে সমালোচিত) বাজেট। তারা বলছেন, এ বাজেট নিয়ে সবাই ‘ক্রিটিসাইজ’ করছে। এমনকি সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি মন্ত্রীরাও ‘ক্রিটিসাইজ’ করছেন। এর আগে কখনো মন্ত্রীরা বাজেট নিয়ে এমন ‘ক্রিটিসাইজ’ করেননি। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সিপিডি বাজেট সংলাপ-২০১৭’ তে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বক্তারা।

সিপিডির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন-পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ ছাড়া সংলাপে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। সভাপতিত্ব করেন সিপিডি চেয়ার?ম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আবুল কালাম আজাদ, সিপিডির সম্মানিত ফেলো দেবপ্রীয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা, সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এনাম আহমেদ, সাবেক সচিব সোহেল হায়দার চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুুল মজিদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আসিফ ইব্রাহিম, ব্যাংকার নুরুল আমিন প্রমুখ। সিপিডির সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, এবারই প্রথম সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা বাজেটের ক্রিটিসাইজ করেছেন। আমাদের দেশে স্থায়ী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে বাজেট দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ভারত, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে আলোচনার ভিত্তিতে বাজেট দেওয়া হয়। একটি টাস্কফোর্স কমিটি করে এসব দেশে কিভাবে বাজেট দেওয়া হয় তা পর্যালোচনা করে আমাদের একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাজেট বড় হচ্ছে। প্রতি বছরই বাজেট বড় হোক, বড় বাজেটকে স্বাগত জানাই। তবে কিভাবে রাজস্ব আদায় হবে, কিভাবে অর্থ খরচ করা হবে, কিভাবে এ বড় বাজেট বাস্তবায়ন হবে-সেসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।

ভ্যাটের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাটের হার একটু বেশি। ভ্যাটের হিসাব রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের একটি বড় অংশ অর্থাৎ অশিক্ষিত মানুষেরা শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছেন। আবগারি শুল্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ৫০০ টাকা বা ৮০০ টাকা নয় আবগারি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে। যেখানে ট্যাক্স থাকে সেখানে কোনো আবগারি শুল্ক থাকা উচিত নয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ হিসেবে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ বাংলাদেশে বাড়ছে না। সুশাসনের অভাব রয়েছে, বেসরকারি খাত ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) পাচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরের সমস্যাও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। ব্যাংকিং খাত সংস্কারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে বাজেট থেকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে না।

সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, আমরা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পলিসি করছি। বিনিয়োগের পলিসি গ্রহণ করছি। কিন্তু কর্মসংস্থানের কোনো পলিসি করছি না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পলিসি করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপিঋণ বাড়ছে। অন্যদিকে বাজেট থেকে ব্যাংকগুলোকে অর্থায়ন করা হচ্ছে। এরশাদ সরকারের আমল থেকেই ব্যাংকে অর্থায়ন করা হচ্ছে। খেলাপিঋণ আদায়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।

ব্যাংকের আবগারি শুল্ক ও ভ্যাটের বিষয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ দেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানি করবেন না। মানুষের ক্ষতি হয়-এমন কিছু বাজেটে থাকবে না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর একটি বাজেট আমরা পাব, যেখানে কোনো সমস্যা থাকবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবদুুর রাজ্জাক বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। স্কুল-কলেজে এখনো ছেলে-মেয়েদের বসার জায়গা নেই। তিনি বলেন, আমরা সব সময় কৃষির ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা যখন ক্ষমতায় আসি, তখন টিএসপি সার ছিল ৭২ টাকা কেজি। সেই টিএসপি আমরা ২২ টাকায় নামিয়ে এনেছি। ৬০ টাকার পটাশিয়াম ১৫ টাকায় নামিয়ে এনেছি।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বাজেটকে আমরা প্রান্তিকের প্রান্তিক পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। এটি মোস্ট ক্রিটিসাইজড বাজেট না, সর্বাধিক আলোচিত বাজেট। যে বাজেটকে লোহার গেট দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল, আমরা সেটাকে ওপেন করে দিয়েছি। গ্রামের সাধারণ মানুষও এখন বাজেট নিয়ে আলোচনা করে। ব্যাংকের আবগারি শুল্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক ব্রিটিশ আমল থেকেই ছিল। আস্তে আস্তে এটি বেড়েছে। আমরা এক লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্কমুক্ত করেছি। ঐতিহাসিকভাবে থাকা ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক আমরা খালাস করে দিয়েছি। এক লাখ টাকার ওপর হিসাবের ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি সø্যাপ করে দিয়েছি। আমাদের হিসাবে ৮০ শতাংশ ব্যাংক হিসাব এক লাখ টাকার নিচে রয়েছে। বর্তমান সরকারকে ‘ঝুঁকিবাজ সরকার’ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা ঝুঁকিবাজ সরকার। আমরা হিসাব করে ঝুঁকি নেই। ঝুঁকি নেওয়ার কারণে বিডিবিএল লোকসান থেকে লাভে এসেছে।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে না। কারণ আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা নিয়ে সঠিক বিনিয়োগ করতে পারছি না। আমাদের শিক্ষিত সমাজ বেকার থেকে যাচ্ছে। আমরা মেগা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করছি। যারা স্বৈরাচার সরকার তারা মেগা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করে জনগণকে দেখাতে চায় উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে উন্নয়ন হয় না। কাজ সঠিক সময়ে শেষ হয় না, দফায় দফায় খরচ বাড়ে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এনাম আহমেদ বলেন, এ বাজেট হলো ‘মোস্ট ক্রিটিসাইজড’ বাজেট। এর আগে কখনো কোনো বাজেট নিয়ে এমন ‘ক্রিটিসাইজ’ হয়নি।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, অর্থমন্ত্রী জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট দিতে গিয়ে অনেক বিষয়ের প্রতি নজর দিতে পারেননি। তিনি সংবাদপত্রের ওপর ভ্যাট আরোপ করেছেন। এটি অর্থমন্ত্রীর একটি বড় ভুল। আমরা আশা করি অর্থমন্ত্রী এটি প্রত্যাহার করে নেবেন।

এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের অর্থনীতিতে ৬০ শতাংশই কালোটাকা। যে কারণে কর জিডিপির হার কম।

সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অর্থমন্ত্রী যে বাজেট দিয়েছেন, সেখানে তিনি মনগড়া কতগুলো বিষয় বলে দিয়েছেন। আমি মনে করি, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

"