প্রার্থী হতে চান আমলারাও

আইন সংশোধনে ইসিকে অনুরোধ করছেন অনেকেই

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

অবসরের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আইনের সংশোধনী চান সরকারি চাকরিজীবীরা। এজন্য বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারা (উপধারা ঝ ও এইচ) বিলোপে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন আমলাদের কেউ কেউ। কেননা প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতায় বলা আছে, সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক কর্মকর্তারা চাকরি ছাড়ার তিন বছরের আগে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

এদিকে ইসির আরপিও সংশোধন করার উদ্যোগে আমলাদের তৎপরতা আরো বেড়েছে। লক্ষ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা। এ তালিকায় সাবেক ও বর্তমান আমলা ছাড়াও আগামী নির্বাচনের আগে অবসরে যাবেন-এমন কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

কমিশন সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রাখছেন। অনেকে অবসরে যাওয়ার পর একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। বিষয়টি নিয়ে শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান-এমন ব্যবসায়ী মহল সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টির বিধানটি বহাল রাখার পক্ষে থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সংশোধনের পক্ষে। তাদের চুক্তি, ব্যবসাকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে টাকা দিয়ে নমিনেশন নিয়ে এমপি হয়ে ব্যবসায় বিস্তার ঘটান। ফলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। সেই দিক থেকে সমাজের উচ্চশিক্ষিত প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাজনীতিতে এলে কুসংস্কার পরিবর্তনসহ নতুন প্রজন্ম সুন্দর ও স্বচ্ছ আইন পাবে, রাষ্ট্র ও সমাজ সঠিকভাবে পরিচালিত হবে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, চাকরি ছাড়ার পর যাতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন সমসাময়িকদের অনেকে যোগাযোগ রাখছেন। তারা অনুরোধ জানাচ্ছেন, প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আরপিওতে যে বিধানটি রয়েছে, সেটি যেন বাদ দেওয়া হয়। তবে এটি তার পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে সচিব জানান, আইন, বিধিবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত কমিটি রয়েছে তারা বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।

আরপিও সংশোধন-সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক ও নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে এখনো সেভাবে আলোচনা হয়নি। কারণ আইন সংস্কার কমিটি কাজ শুরু করেননি। আশা করছি, ঈদের পরেই মাঠ কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রস্তাবনাসহ আর কী কী সংস্কার আনা প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে আলোচনা হবে। গত কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ কমিশনের সময়ে এই ইস্যুটি উত্থাপন হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটি সংশোধন করেননি। এবার আইন সংস্কার কমিটিতে লিখিত প্রস্তাব এলে এবং আলোচনা হলে এটি অন্য আইনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কারণ কমিশন প্রস্তাব করলেও আইন পাস করবে সরকার।

জানা গেছে, ১/১১ পুনর্গঠিত ড. শামসুল হুদা কমিশন স্থানীয় স্তরের পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও কমিশনের কাছে দায়বদ্ধতা তৈরিতে বিশদ পরিসরে আইনে সংস্কার আনে। নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে প্রার্থী মনোনয়ন সব পর্যায়ে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসে। প্রার্থীদের লাগামহীন খরচেও বৈধসীমা নির্ধারণ করা হয়। নিবন্ধনের আওতায় আনা হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে। ফলে শত শত ভূঁইফোড় দল রাজনীতি করার সুযোগ হারায়। নানা সংস্কারের মধ্যে হঠাৎজুড়ে আসা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধে আইন প্রণয়ন করা হয়। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বিধানটি প্রযোজ্য করা হয়। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি টানা তিন বছর সম্পৃক্ত না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রার্থিতায় অযোগ্য হবেন। আর অবসর গ্রহণের পর তিন বছর অতিবাহিত না হলেও প্রার্থী হতে পারবেন না সরকারি আমলারা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সেনাবাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়। আরওপিও থেকে বিলুপ্ত করা হয় অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়া সংক্রান্ত বিধানটিও। তবে বহাল রাখা হয় সরকারি কর্মকর্তাদের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিধানটি।

ড. শামসুল হুদা কমিশনের পর কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন সাংবিধানিক পদে এসে নির্বাচনী আইনে সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়। এমনকি মাঠ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আইন সংস্কারের প্রস্তাব ও মতামত গ্রহণ করে। সে সময় আমলারা রাজনীতি করার সুযোগ দাবি করে আরপিও থেকে তিন বছরের বার বিলোপের দাবিতে সোচ্চার হোন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সে তৎপরতা কাজে আসেনি। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি খান মো. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রণয়ন করে। এতে নির্বাচনী আইন সংস্কারের একটা সময়সীমা রাখা হয়।

জানতে চাইলে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) পরিচালক আব্দুল আলীম বলেন, বিধানটি বাদ দিলে অনেকে নিজ নির্বাচনী এলাকায় চাকরিকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। প্রশাসনেও রাজনীতীকরণের প্রভাব বাড়বে। তাই কোনোভাবেই আমলাদের প্রার্থিতায় শিথিলতা সমীচীন হবে না।

একজন রাজনীতিবিদ বলেন, সরকারের উচ্চপদে চাকরি করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা কায়েম করে ফেলেন। আর যারা সার্বক্ষণিক রাজনীতি করেন তাদের টাকা না থাকার কারণে প্রার্থী হতে পারবেন না। তাই রাজনীতিবিদদের হাতে রাজনীতি যাতে থাকে সেজন্য বিধানটি বহাল রাখাই শ্রেয়।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, কালো টাকার মালিক, ব্যবসায়ী এবং অশিক্ষিত ব্যক্তিদের হাতে রাজনীতির নাটাই থাকার কারণে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে না। সরকারি চাকরিজীবীরা শিক্ষিত এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ, তারা রাজনীতি করার সুযোগ পেলে নির্বাচনী ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। তাই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনীতি করার সুযোগ রাখাই শ্রেয়।

এদিকে আরপিও সংশোধনে ইসিকে মতামত দিয়েছেন ইসির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। এর আগে সংশোধনের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মতামত চেয়ে গত ২৮ মে চিঠি পাঠায় ইসি। আইনটি যুগোপযোগী করতে কোনো অনুচ্ছেদ সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজন করা প্রয়োজন কি না, তা যাচাই করে মতামত দেওয়ার জন্য আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা হয়। মাঠপর্যায়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে আঞ্চলিক নির্বাচনী কর্মকর্তা মতামত লিখিত আকারে ইসির সচিবালয়ে পাঠান।

ইসি সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রস্তাবগুলো সমন্বয় করে প্রথমে কমিশন সভায় উত্থাপন করা হবে। পরে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপে বসবে ইসি। এরপরই আরপিও সংস্কারের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হবে।

মাঠ কর্মকর্তাদের পাঠানো উল্লেখযোগ্য মতামতগুলোর মধ্যে আচরণবিধি প্রতিপালনে ইসির কর্মকর্তাদের সীমিত পরিসরে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান, বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ণয়ে পুনরায় ‘না’ ভোটের বিধান বহাল, নির্বাচনে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার এবং ভিডিপির পাশাপাশি ‘সেনাবাহিনী’ বহাল। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের বিধান সংক্রান্ত ধারা বাতিল। সংসদ নির্বাচনে ডিসিদের বদলে ইসির অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরি ছেড়ে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করতে আইনের ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করেননি একজন কর্মকর্তাও।

"