চালের বাজারে ‘সংকট’

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে চালের দাম। প্রধান খাদ্য চালের দাম গত তিন মাস ধরে বাড়তে থাকায় কষ্টে পড়েছে সাধারণ মানুষ। প্রতি সপ্তাহে কেজিতে কয়েক টাকা করে দাম বাড়ছে। সরকারি হিসাবেই গত এক মাসে সাধারণ মানের মোটা চালের দাম বেড়েছে আট শতাংশের বেশি; আর এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। বাজারে চালের সংকট ও ধানের দাম বেশি হওয়াকে দূষছেন মিল মালিকরা। অন্যদিকে, সরকার বলছে, ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। শুল্ক কমিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করলে দাম কমানো সম্ভব বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ফেলো এম আসাদুজ্জামান বলেন, চাল আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। তাহলে আমদানি খরচ কমবে, দাম কমানোও সম্ভব হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) তথ্য অনুযায়ী, ১২ জুন সরকারি গুদামগুলোতে এক লাখ ৯৩ হাজার ১৯০ মেট্রিক টন চাল ছিল। আর গত বছর একই দিনে মজুদের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার ২০ লাখ টন।

এদিকে, সরকার গত ২ মে থেকে বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরুর পর ১১ জুন পর্যন্ত ১৯ হাজার ৫৩২ টন সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।

চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, কিছু মজুদদার এবং বিএনপি ঘরানার ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়ানোর জন্য দায়ী। চালের সংকটের কোনো প্রশ্নই উঠে না। সম্প্রতি ব্যবসায়ীরা যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য আমরা বিদেশ থেকে চাল আমদানি করছি। খুব শিগগির দাম কমে যাবে। ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের পরাস্ত করতে পারবে না।

চালের বাজারের অস্থিরতা প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে চালের দাম। সরকার স্বীকারই করতে চায় না যে চালের দাম ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় এ বছর আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। আরো ১৯টি জেলায় ধানখেতে ছত্রাকের আক্রমণে (ব্লাস্ট রোগ) উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুই কারণে এ বছর ১০ লাখ টনের বেশি বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।’

বাজারে গিয়ে দেখা যায়, স্বর্ণা, পাইজাম, চায়না ইরির মতো ভালো মানের মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। আর নিম্নমানের মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬ টাকায়। মিনিকেট ও নাজিরশাইলের মতো সরু চাল ৫৬ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর পাইকারি বাজার বাবু বাজারে দেখা যায় কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা কম।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলেন, চালের দামের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই। মিল থেকে কেনা দামের সঙ্গে প্রতি বস্তায় ৫৫ টাকা পরিবহন খরচ ধরে তার ওপর ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ রেখে তারা পাইকারিতে বিক্রি করেন।

কুষ্টিয়ায় মোটা চালের বস্তা ১৯৫০ টাকা (কেজিতে হয় ৩৯ টাকা) এবং মিনিকেট ২৬০০ টাকায় (কেজিতে দাঁড়ায় ৫২ টাকা) ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ধানের দাম বাড়ার কারণে এই পরিস্থিতি বলে মনে করেন মিল মালিকরা। তারা বলছেন, প্রতি মণ ধান কিনতে ১২০০ টাকার বেশি লাগছে। প্রতি মণ ধানে চাল পাওয়া যায় ২৭ কেজির মতো।

পুরান ঢাকার বাবু বাজারের মেসার্স শুভ শান্ত রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম বলেন, অন্যান্য বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে বোরো ধান উঠলে চালের দাম কমে যেত। কিন্তু এবার চিত্রটা পুরো ব্যতিক্রম। নতুন চাল বাজারে আসার পরও চালের দাম আরেক দফা বেড়েছে।

তিনি আরো বলেন, হাওরে ফসল নষ্টের অজুহাতে নতুন চাল আসার পরও মিল মালিকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর ধাপে ধাপে দাম বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে একটি চক্র (সিন্ডিকেট)।

বাবু বাজারের মেসার্স চৌধুরী রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক আবদুল জব্বার ভা-ারি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প গ্রুপগুলো অটোমিল করে সারা দেশের চাল নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে সরকার চালের মূল্য স্বাভাবিক অবস্থায় নামিয়ে আনতে পারছে না।

আর স্বর্ণা অটো রাইস মিলের মালিক কুষ্টিয়া জেলা রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুস সামাদ বলেন, ধানের বাজার বাড়তি। সিন্ডিকেট হবে কি করে, ১২০০ টাকায়ও তো ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে দিনাজপুর চালকল মালিক সমিতির সভাপতি সরওয়ার আশফাক লিয়ন বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে ধানের সংকট আছে। ধানের দামও অনেক বেড়ে গেছে।

বাজারে ধানের সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে দিনাজপুর জেলা খাদ্য বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক (ডিসি ফুড) এস এম কায়সার আলীর বক্তব্যেও। তিনি বলেন, জেলায় আড়াই হাজার চালকল রয়েছে। সরকারের কাছে চাল বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে মাত্র ৬০০। এই জেলা থেকে ৮৬ হাজার মেট্রিকটন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গুদামে এসেছে মাত্র ৩০ হাজার মেট্রিক টন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান বলেন, ট্যারিফ তুলে দিতে মে মাসের শুরুর ?দিকেই খাদ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। সরকার বিবেচনা করে সুবিধাজনক সময়ে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বোরো মৌসুমের ধান এখন আর কৃষকের হাতে নেই। যাদের কাছে আছে তাদেরকে মজুদদার কিংবা বিত্তশালী কৃষক বলা যেতে পারে। সুতরাং, এখন ট্যারিফ প্রত্যাহার করলে এর প্রভাব সাধারণ কৃষকের ওপর পড়বে না, বরং বাজার স্বাভাবিক হবে।

"