আজও বাস্তবায়ন হয়নি পাহাড় ও বাসিন্দাদের সুরক্ষার ৩৬ সুপারিশ

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৭, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

দেশের পার্বত্য অঞ্চলে প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসে ১৪৫ জনের মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন দেশ। স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে আছে পাহাড়। সর্বস্ব খুইয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা। এরই মধ্যে আবহাওয়া অধিদফতরের পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের সতর্কতা-আরো বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর পাদদেশে বসবাসরত অসহায় মানুষগুলোকে। অধিদফতর গতকালও এসব এলাকায় অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে।

প্রতিবারের মতো এবারও পাহাড়ধসের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত চার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জোর তৎপরতার সঙ্গে চলছে উদ্ধারকাজ। পাহাড়গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি ও সেখানকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে জরুরি সাহায্যের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। শোক প্রকাশের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন দুর্যোগ উপশমে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।

পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বাসিন্দাদের সুরক্ষায় প্রশাসনের এসব প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, গত ১০ বছরেও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শুধু বর্ষা এলেই বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার কথা মনে পড়ে প্রশাসনের। বর্ষা শেষে বিষয়টি কেউ মনে রাখে না। এমনকি পাহাড় সুরক্ষায়ও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ফলে এ প্রবল বর্ষণেও নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস করছে নিম্ন আয়ের অসংখ্য অসহায় মানুষ।

পাহাড় ও পাহাড়ের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ধসের মূল কারণ মানুষ। একশ্রেণির রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা নির্বিচারে পাহাড় কেটে সেখানে ঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ঝুঁকি জেনেও বসত গাড়ছে সেখানে। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, ইটভাটা মালিকসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে পাহাড় ও গাছপালা কেটে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলছে। প্রশাসনের দুর্নীতির কারণেই নির্বিচারে কেটে পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এ চক্র। অথচ এদের বিরুদ্ধে কখনোই কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

দুর্যোগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় বসবাসের একটি মাত্রা, ঘনত্ব ও নিয়ম আছে। প্রতিটি ভূমির নিজস্ব ধারণক্ষমতা আছে। ধারণ ক্ষমতার মাত্রা অতিক্রম করেছে বলেই প্রতিবছরই ভূমিধসের সম্ভাবনা আরো জোরালো হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের এমন অনেক জায়গায় এখন বসতি গড়ে উঠছে যেটি একসময় চিন্তা করা যায়নি। গত এক দশকে বৃহত্তর চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আবাসনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এখন বিপজ্জনক জায়গাগুলোকে খুব একটা আমলে নিচ্ছে না। ঘরবাড়ি তৈরির জন্য পাহাড়কে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে ধসের প্রবণতা বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় ২০০৭ সালে প্রথম কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। সে বছরের ১১ জুন কেবল চট্টগ্রামেই পাহাড়ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। তখন ওই ঘটনায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি করা হয়। সে কমিটিই প্রথম পাহাড়ধসের ২৮ কারণ চিহ্নিত করে। রক্ষা ও ধস ঠেকাতে প্রণয়ন করে ৩৬ দফা সুপারিশ। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি গত ১০ বছরেও। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাহাড়খেকোদের একটি তালিকাও দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গত ১০ বছরে পাবর্ত্য জেলা চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো জেলার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও বাসিন্দাদের কোনো তালিকাও করতে পারেনি প্রশাসন। এমনকি এখন পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের মধ্যে ৫ শতাংশও নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া যায়নি।

২০০৭ সালের ওই কমিটির সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে পাহাড়ধসের পর কমিটি এর প্রতিকারের জন্য যেসব সুপারিশ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। বরং এ সময়ের মধ্যে কাটতে কাটতে পাহাড়কে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে। পাহাড়গুলো ৩০ ডিগ্রির বেশি ঢালু হলে সে পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হয়। পার্বত্য জেলাগুলোয় রয়েছে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত অসংখ্য ঢালু পাহাড়। মাটির জমাটবাঁধা পাহাড় কেটে মাটির ওপরের আবরণ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। এখন প্রবল বর্ষণের সময় প্রবল স্রোতে জলধারা নিচে ধাবিত হয়, তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাটি এসে পাহাড়ের পাদদেশে আছড়ে পড়ছে। ফলে পাহাড়ধসের ঘটনাও বেড়েছে। আবার এসব পদদেশ থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে না নেওয়ায় প্রাণ যাচ্ছে তাদের।

উপেক্ষিত ৩৬ সুপারিশ : ২০০৭ সালে গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি পাহাড়ধসের পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে নোটিশ টাঙানোসহ ঝুঁকির ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করেছিল। ঝুঁকির ২৮ কারণের মধ্যে ছিল-ভারী বর্ষণ, পাহাড়ে বালির আধিক্য, পাহাড়ের উপরিভাগে গাছ না থাকা, গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা, পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস গড়ে তোলা, পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখা, বনায়নের পদক্ষেপের অভাব, বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি ও মাটি অপসারণে দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য। আর ৩৬ সুপারিশের মধ্যে ছিল-পাহাড়ি এলাকার বস্তি পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ ও স্বল্প আয়ের লোকদের পুনর্বাসন করা, পাহাড়ি এলাকায় সবুজ বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পাহাড়ের গা ঘেঁষে নতুন করে বস্তি গড়ে উঠতে না দেওয়া, সংশ্লিষ্ট পাহাড়ের মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, বনাঞ্চল তৈরি, পাহাড়ের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প গড়ে না তোলা, ঢালু পাহাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারণের ব্যবস্থা করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, যেসব পাহাড় প্রায় খাড়া অবস্থায় রয়েছে সেখানে স্বাভাবিক বনায়ন সম্ভব না হলে মুলি বাঁশ রোপণ ইত্যাদি।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ২০০৭ সালের ওই কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি বলেই আজ এমন ভয়াবহ ধস ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনেরও গাফিলতি ছিল। আগে দেখেছি অধিক বৃষ্টিপাত হলে স্থানীয় অধিবাসীদের প্রশাসন সতর্ক করত। এবার কিন্তু সেটি হয়নি। প্রশাসনের উচিত ছিল পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়া বা সতর্ক করা। কিন্তু তারা সেটি সঠিকভাবে করতে পারেনি।

নেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও বাসিন্দাদের তালিকা : এখন পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও সেখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসরত পরিবারের সংখ্যা নিরূপণ করতে পারেনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদফতর। ২০০৭ সালে পাহাড়ধসের পর গঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি পাহাড় চিহ্নিত করেছিল এবং সেখানে কমপক্ষে পাঁচ হাজার পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে বলে জানিয়েছিল। তবে বেসরকারি তথ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় কয়েক লাখ পাহাড়ি এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে। নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে গত ২০ বছরে কেবল চট্টগ্রামেই ১১০টি পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুুল আজিজ বলেন, পাহাড়ে বসবাসকারীদের প্রকৃত কোনো পরিসংখ্যান নেই। তারা অবৈধভাবে পাহাড়ে বসবাস করছে। বর্ষার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরে যেতে বলেছি। কিন্তু তারা শোনেনি।

কারা পাহাড় কাটছে : রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধেও নিয়ম ভেঙে পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রমতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এমনকি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধেই পাহাড় কাটার অভিযোগ আছে। ২০০৯ সালে পরিবেশ অধিদফতর পাহাড়ধসের জন্য দায়ী কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পাহাড় কাটার অভিযোগে চিহ্নিত করেছিল ১৩টি হাউজিং প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মাসুদ করিম বলেন, পাহাড় কাটা বন্ধের জন্য সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। যারা পাহাড়কাটার সঙ্গে জড়িত তাদের উচ্চ অঙ্কের জরিমানা করছি, সরঞ্জাম জব্দ করছি, মামলা করছি। কিন্তু পাহাড় কাটা থামছে না। এর জন্য এই কর্মকর্তা পরিবেশ অধিদফতরের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান লোকবল দিয়ে দেশের দুর্গম এলাকায় পাহাড় কাটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মামলা হলে নানা ফাঁকফোকর গলে আসামিরা বের হয়ে যান।

"