ফের পাহাড়ধস চারজনের প্রাণহানি

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৫

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৭, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

নিম্নচাপের প্রভাবে দুই দিনের টানা বর্ষণে ফের পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটল। এবার খাগড়াছড়িতে বাবা-মেয়ে ও টেকনাফে দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এদিকে টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যয়ের পর ধসেপড়া পাহাড়ের মাটি সরিয়ে গতকাল বুধবার হতাহতদের উদ্ধারে দ্বিতীয় দিনের অভিযান চালান উদ্ধারকর্মীরা।

এদিকে, বিদ্যুৎ না থাকায় রাঙামাটিতে আহতদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ঠিক কবে নাগাদ বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাহাড় ধসে আহতদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ৪৮৩টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পাহাড় ধসে আহতদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা তৎপর থাকার জন্য সব হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই অঞ্চলে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এমনকি চিকিৎসার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত মজুদ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (চিকিৎসা সেবা) সিরাজুল হক খান এবং সচিব (চিকিৎসা শিক্ষা) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদসহ মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মৃণাল কান্তি সেন বলেন, প্রাকৃতিক সমস্যার কারণে বৈদ্যুতিক লাইনগুলো টিকতে পারছে না। অধিকাংশ বৈদ্যুতিক খুঁটি জঙ্গল পরিবেষ্টিত ও পাহাড়ে। ফলে বিদ্যুৎকর্মীদের কাজ করতে ব্যাপক বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খাগড়াছড়ির একটি সাবস্টেশন থেকে রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। মেরামতের কাজ শেষ হলে দ্রুতই আমরা সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পারব।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে দায়িত্বরত কর্মকর্তা দলিল উদ্দিন জানান, পাহাড় ধসের ঘটনায় গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাঙামাটিতে ১০০ জন, চট্টগ্রামে ২৯ জন, বান্দরবানে ৬ জন, কক্সবাজারে দুইজন এবং খাগড়াছড়িতে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে গাছচাপা, দেয়ালচাপা ও পানিতে ভেসে আরো সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে বান্দরবানে আগের দিন নিখোঁজ মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার হওয়ায় সেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে নয়জন হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য। আর খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসের দুটি ঘটনায় দুইজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে গত রোববার থেকে দেশের দক্ষিণ পূর্বের জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টির কারণে মাটি সরে গিয়ে সোমবার রাত থেকে এই তিন জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে ধস নামে। সেই সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে দেখা দেয় ভয়াবহ বিপর্যয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বৃষ্টির মধ্যেই মঙ্গলবার ভোর থেকে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।

মঙ্গলবার রাতে আলোর অভাবে অভিযান স্থগিত রাখার পর গতকাল সকালে আবারও মাটি সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি শুরু হয়।

রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দিদারুল আলম জানান, শহরের ভেদভেদিসহ যেসব স্থানে মঙ্গলবার মাটি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি, সেখানে বুধবার সকালে তারা কাজ শুরু করেন। পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটিতেই। সদর, কাউখালী, কাপ্তাই, জোড়াছড়ি ও বিলাইছড়ি মিলিয়ে ১০০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক মানজুরুল মান্নান জানিয়েছেন। এর মধ্যে মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের কাছে পাহাড় ধসের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে ফের ধসে নিহত হন দুই কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্য।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ইউনিয়নের মইন্যারটেক ও পাহাড়তলী ঘোনা, রাজানগর ইউনিয়নের জঙ্গল বগাবিল, চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের শামুকছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পাহাড় ধসে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বান্দরবান ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম জানান, শহরের কালাঘাটায় এক কলেজছাত্র, লেমুঝিরি ভেতর পাড়ায় একই পরিবারের তিন শিশু এবং সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরু সম্বোনিয়া পাড়ায় তিনজনের লাশ পাওয়া যায় মঙ্গলবার। এ ছাড়া জেলেপাড়ায় পাহাড় ধসের পর নিখোঁজ মা কামরুন্নাহার ও মেয়ে সুফিয়ার লাশ বুধবার উদ্ধার করা হয়। গতকাল রাঙামাটির ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫০ লাখ টাকা, ৫০০ বান্ডেল টিন ও ১০০ টন চাল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা ও ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া তিন জেলায় ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে চার থেকে সাড়ে চার হাজার মানুষকে সেখানে রাখা হয়েছে বলে আগের দিনই এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ত্রাণমন্ত্রী মায়া চৌধুরী।

কক্সবাজার : টেকনাফ থানার ওসি মো. মাঈন উদ্দিন জানান, টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম সাতঘরিয়া পাড়ায় গতকাল বুধবার সকালে পাহাড় ধসে নিহতরা হলেন মোহাম্মদ সলিম ও তার মেয়ে তৃষামনি।

সলিমের পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা একটি কাঁচাঘরে বসবাস করছিল। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ করেই পাহাড় ধসে পড়ে। স্থানীয়রা মাটি সরিয়ে তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে বাবা-মেয়ের লাশ পায়।

খাগড়াছড়ি : লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ ইকবাল জানান, সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বর্ষণে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতেও পাহাড় ধসে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার খাগড়াছড়িতে দুইজনের মৃত্যু হলেও খবর পাওয়া যায় গতকাল সকালে। উপজেলার দুর্গম বর্মাছড়ি ইউনিয়নে মঙ্গলবার ভোরে পাহাড় ধসের দুটি ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়। ওই এলাকা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোনেও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বুধবার সকালে খবরটি পাওয়া গেছে।

নিহতরা হলেন- বর্মাছড়ি ইউনিয়নের ফত্যাছড়াপাড়ার প্রাণকৃত্য চাকমার ছেলে পরিমল চাকমা (৩০) ও হলুদ্যাপাড়া বড়ইতলী এলাকার পতুল্যা চাকমার স্ত্রী কালেন্দ্রী চাকমা (৪৫)। এসব দুর্ঘটনায় আহত আরো তিনজনকে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

"