বনানীতে দুই ছাত্রী ধর্ষণ

ভিডিও ফুটেজ পুলিশের হাতে

নাঈমের পরামর্শে চলতেন সাফাত

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৭, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণকান্ডের ভিডিও ফুটেজ এখন পুলিশের হাতে। প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের মোবাইল ফোন থেকে এই ভিডিও উদ্ধার হয়েছে। এবার সাফাতের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুই তরুণীর একজন। এদিকে, গ্রেফতার নাঈম আশরাফ ওরফে হালিম ধর্র্ষণ মামলার প্রধান আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের অলিখিত উপদেষ্টা ছিলেন। সাফাত হালিমের পরামর্শেই চলতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে সাফাতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে থেকেই তার বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেন সেলিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন হালিম। ডিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, ভিডিও ফুটেজ ও ছবি উদ্ধারের বিষয়টি মামলার পর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রায় ৬ মাস ধরে সাফাতের রিমোট কন্ট্রোল ছিল হালিমের কাছে। জিজ্ঞাসাবাদে আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন হালিম। তবে সবকিছুই তারা প্রকাশ করতে চাইছেন না তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে সাফাতের সাবেক স্ত্রী ফারিয়া মাহ্বুব পিয়াসার বক্তব্যেও। পিয়াসা বলেন, সাফাতকে নষ্ট করেছে তার বাবা। তার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে হালিমকে। হালিমই সাফাতকে মেয়ে সরবরাহ করতেন। ২০১৪ সালের শেষের দিকে পরিচয় হলেও গত জানুয়ারি থেকেই হালিমের সখ্য গড়ে ওঠে সাফাতের সঙ্গে। এদিকে, সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতের সংগীত শিল্পী আরজিৎ সিংয়ের কনসার্টকে কেন্দ্র করে সাফাতের সঙ্গে পরিচয় হয় নাঈম আশরাফ ওরফে হালিমের। হালিমের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম ‘ইমেকার্স’ ওই কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। ওই কনসার্টের স্পন্সর ছিল আপন জুয়েলার্স। তবে এর আগ থেকেই সাফাতের বাবা দিলদার হোসেন সেলিমের সঙ্গে বিশেষ সখ্য তৈরি হয় হালিমের। দিলদার হোসেন সেলিমকে মিডিয়ায় কাজ করেন এমন অনেক সুন্দরীর সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিলেন হালিম।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন জানান, আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে থাকা আসামি হালিম, বিলাল এবং রহমত আলীকে জিজ্ঞসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। হালিম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তদন্ত-সংশিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, বাদীর তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আমাদের ধারণা সাফাত, সাকিফ গং ভিডিওচিত্রটি দেখিয়ে ওই ভুক্তভোগীকে দিনের পর দিন ভোগ করতে চেয়েছিল। ভিডিও চিত্র ধারণের জন্য সাফাতকে পরামর্শ দিয়েছিলেন নাঈম আশরাফ এবং সাদমান সাকিফ। রেইনট্রি হোটেলের কর্মকা-ের পর থেকেই সাফাত গং বিভিন্ন সময় ধর্ষিতাদের ফোন করে তাদের কাছে যেতে বলতেন। এক পর্যায়ে ধর্ষকদের নম্বর ভুক্তভোগীরা ব্লক করে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা টেক্সট ম্যাসেজ পাঠাতেন।

ভুক্তভোগীর পরিবার জানিয়েছে, দুই ছাত্রী ধর্ষণের ভিডিওর বিষয়টি জানার পর তা মুছে ফেলার জন্য সৌরভ ও পাপ্পু নামের তাদের দুই বন্ধুকে সাফাত, সাকিফ ও নাঈমের কাছে পাঠিয়েছিল। সম্প্রতি একটি ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে একজন ধর্ষিতার ছবি আপলোড করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের ডিসি বলেন, আমরা কতগুলো একাউন্ট ডিলিট করব? ছবিগুলো অন্যের কাছে যায় কিভাবে? আমরা আমাদের মতো কাজ করছি।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, বিল্লাল আগেই দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছে। নাঈমের সামনে ফের একই ধরনের বক্তব্য দেয়। এ সময় নাঈমের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিল্লাল যা বলেছে তা ঠিক কি না? তখন নাঈম ঠিক বলে সম্মতি দেয়। সেই সঙ্গে নাঈম এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের কথাও স্বীকার করেছে। এ ছাড়াও জিজ্ঞাসাবাদের সময় নাঈমের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, সাফাতের সঙ্গে তার কিভাবে পরিচয়, দুই শিক্ষার্থী ছাড়াও অন্য কাউকে ধর্ষণ করেছে কি না, গুলশান এলাকার ইয়াবা, সিসা বারগুলোতে কিভাবে অনৈতিক কাজ করত তারা, সাফাত, সাদমান ছাড়াও তার সঙ্গে আর কার কার সঙ্গে পরিচয় আছে।

গত বুধবার রাতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে গ্রেফতারের পর নাঈম আশরাফ ওরফে হাসান মোহাম্মদ হালিমকে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে সাফাতের গাড়িচালক বিলাল ও দেহরক্ষী রহমত আলী ওরফে আবুল কালাম আজাদকে পর্যায়ক্রমে চার দিন ও তিনদিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। আজ শনিবার আজাদের তিন দিনের রিমান্ড শেষ হচ্ছে। বিল্লালের রিমান্ড শেষ হবে রোববার। এরা দুই তরুণীকে ধর্ষণের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে।

গত ২৮ মার্চ ধর্ষণের ঘটলেও প্রভাবশালী আসামিদের হুমকির কারণে মামলা করতে এক মাসের বেশি সময় দেরি করার কথা বাদী নিজেই এজাহারে বলেছেন। পুলিশ সেই মামলা নিতে গড়িমসি করেছিল বলে অভিযোগ ওঠায় ধর্ষণের ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার নির্দেশে তদন্ত সহায়ক চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়। ঘটনার পর বনানী থানায় মামলা গ্রহণে গড়িমসি ও তরুণীদের হয়রানির অভিযোগ বিষয়েও একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) মিজানুর রহমান। ইতোমধ্যে কমিটি বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই কমিটিও ইতোমধ্যে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। এর মধ্যে একটি কমিটি মামলা নিতে গড়িমসি, প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ পেয়ে বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। বনানী থানার ওসি অভিযোগের মৌখিক ও লিখিত জবাব দিয়েছে তদন্ত কমিটিকে।

গত ২৮ মার্চ বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জš§দিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই দুই তরুণী। গত ৬ মে সন্ধ্যায় বনানী থানায় সাফাতসহ পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন ভুক্তভোগী তরুণীদের একজন। গত ১১ মে রাত ৯টার দিকে সিলেটের পাঠানটুলী এলাকার একটি বাড়ি থেকে এজাহারভুক্ত প্রধান দুই আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও র‌্যাগনাম সেন্টারের মালিকের ছেলে সাদমান সাকিফকে প্রথম গ্রেফতারের পর গত বৃহস্পতিবার তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পরবর্তীতে গ্রেফতার তাদের সহযোগী নাঈম আশরাফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন এবং বডিগার্ড রহমত আলী বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন।

ধর্ষণের ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার: ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের পুত্র সাফাত আহমেদের মোবাইল ফোন থেকে এই ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার হয়েছে। এ ঘটনায় সাফাতের বিরুদ্ধে বনানী থানায় আইসিটি অ্যাক্টে একটি মামলা করবে দুই অভিযোগকারীর একজন। ডিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, ভিডিও ফুটেজ ও ছবি উদ্ধারের বিষয়টি আইসিটি আইনে মামলা দায়েরের পর জানানো হবে।

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল দ্য রেইনট্রি হোটেলের ৭০১ নম্বর কক্ষের বাথরুম থেকে মোবাইল ফোন দিয়ে ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করে। বাথরুমের দেয়ালের কাচের রুমের দিক থেকে কিছুই দেখা যাবে না। কিন্তু বাথরুম থেকে দেয়ালের কাচ দিয়ে রুমের ভেতরের সব কিছু দেখা যায়। ভিডিও করার পর সাফাত তার মোবাইল ফোনে ওই ফুটেজ নিয়ে নেয়। ধর্ষণের ঘটনার কয়েকদিন পর সাফাত তার দেহরক্ষী রহমত আলীকে ওই দুই ছাত্রীর বাসায় পাঠিয়েছিলেন। দুই ছাত্রীর পারিবারিক বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার জন্য। সাফাতের নির্দেশে এ কাজ করেছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে রহমত আলী জানান। গাড়িচালক বিল্লাল এই মামলায় চার দিনের রিমান্ডে আছেন। গতকাল তার রিমান্ডের তৃতীয় দিন শেষ হয়েছে। এই মামলায় সাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলীর তিন দিনের রিমান্ড গতকাল শেষ হয়েছে।

এদিকে, মামলার এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি নাঈম আশরাফের সাত দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন ছিল গতকাল। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নাঈমের মুখোমুখি করা হয় মামলার প্রধান আসামি সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী রহমত আলীকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেখানে উপস্থিত ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, বিল্লাল আগেই দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছেন। নাঈমের সামনে ফের একই ধরনের বক্তব্য দেন। এ সময় নাঈমের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিল্লাল যা বলছে তা ঠিক কি না, তখন নাঈম ‘ঠিক’ বলে সম্মত দেয়। সেই সঙ্গে নাঈম এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।

নাঈমের সঙ্গে একাধিক নারীর অনৈতিক সম্পর্কের তথ্য দিয়ে ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘নাঈম আসলে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির তরুণীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পেশাদার দালাল।’ গুলশান ও বনানী এলাকার উচ্চবিত্ত শ্রেণির বখে যাওয়া তরুণ-তরুণীর মধ্যে ইয়াবা সরবরাহ করতেন। ইয়াবা সরবরাহ দিয়েই তিনি এই সোসাইটির খুব কাছে চলে যান।

অপরদিকে, বনানী থানার ওসির কর্তব্যকাজে অবহেলা ও আসামিদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি আরো দুই-তিন দিন পর রিপোর্ট জমা দেবে পুলিশ কমিশনারের কাছে। কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) মিজানুর রহমান। ইতোমধ্যে কমিটি বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই কমিটিও ইতোমধ্যে ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। এর মধ্যে একটি কমিটি মামলা নিতে গড়িমসি, প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ পেয়ে বনানী থানার ওসি ফরমান আলীকে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। বনানী থানার ওসি অভিযোগের মৌখিক ও লিখিত জবাব দিয়েছে তদন্ত কমিটিকে। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে অনেকের বক্তব্য নিয়েছি। বিষয়টির বিভিন্ন দিক আমরা খতিয়ে দেখছি। তদন্তে এ ঘটনায় কারো গাফিলতির প্রমাণ মিললে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

সাফাতের সঙ্গে দুই তরুণীর অন্তরঙ্গ ছবি ফাঁস: এদিকে, ধর্ষণের অভিযোগকারী দুই তরুণীর সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি ফেসবুকে ভাইরাল (ফাঁস) হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার থেকে ছবিগুলো ফেসবুক-টুইটারে ভেসে বেড়াচ্ছে। সামাজিকভাবে হেয় করতে মেয়ে দুটির ছবি ছেড়ে দিয়েছে কেউ। ছবিগুলোতে ধর্ষক সাফাতের সঙ্গে বেশ অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর ছবিও রয়েছে। এদিকে, ভুক্তভোগী তরুণীদের এসব ছবি ছড়ানোর ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করার কথা জানিয়েছেন এক ছাত্রী। তার বক্তব্য, এসব ছবি জোর করে তোলা হয়েছে। এখন সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য ছবিগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সঠিক তদন্ত হলে কে বা কারা এসব ছবি পোস্ট করছে তা বেরিয়ে আসবে।

"