কালোতালিকাভুক্ত হিযবুত তাওহীদ এখনো সক্রিয়

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৬, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারের কালোতালিকাভুক্ত উগ্রপন্থি সংগঠন হিযবুত তাওহীদের কার্যক্রম এখনো চলছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় স্বঘোষিত জামানার ইমাম মোহাম্মদ বায়েজিদ খান পন্নীর লেখা জঙ্গি তৎপরতার উসকানিমূলক বই, পত্রিকা সিডি ও লিফলেট বিক্রি এবং বিলি করছে, এই সংগঠনের কর্মীরা। প্রচারণা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস ও বিভিন্ন ব্লগের মাধ্যমেও। এ ছাড়া রাজধানীর ফার্মগেটে একটি পুলিশ বক্সে বায়েজিদ খান পন্নীর বিভিন্ন লেখাসহ ছবি সাঁটানো দেখা গেলেও গণমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ার আগেই গতকাল তা সরিয়ে ফেলা হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় কালোতালিকাভুক্ত এ সংগঠনটির পত্রিকা বিক্রি ও বিলি হচ্ছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার শহিদনগর এলাকায় নারীরা পাঁচ টাকা মূল্যে এই পত্রিকা বিক্রি করেন। যারা এই পত্রিকা বিক্রি করেন তারাও এই সংগঠনের কর্মী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) ও শাহাদাত-ই-আল হিকমা নামের চারটি জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরও দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় ২০০৯ সালের প্রথমদিকে দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা হিযবুত তাওহীদ ও হিযবুত তাহরিরসহ আরো আটটি সংগঠনকে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে কালোতালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পেশ করে। হিযবুত তাওহীদ ছাড়াও তালিকাভুক্ত অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলো হচ্ছেÑউলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত, ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (আইডিপি), ইসলামী সমাজ, তৌহিদ ট্রাস্ট, তা-আমির উদ-দ্বীন বাংলাদেশ (যে দলটিকে হিজবে আবু ওমর নামেও ডাকা হয়) এবং আল্লাহর দল।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরই জঙ্গিদের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে খোঁজ নেওয়া শুরু হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়। জেলা ও থানা পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে কাজ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর পাশাপাশি হিযবুত তাওহীদসহ আরো আটটি সংগঠন জঙ্গিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে মদত দিচ্ছে। এর পরই মন্ত্রণালয় থেকে এসব সংগঠনকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়। এসব সংগঠনের সঙ্গে কারা জড়িত, অর্থের জোগানদাতা কারা তা খুঁজে বের করতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, কালোতালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রচারণার নতুন কৌশল হিসেবে দলীয় পত্রিকাসহ বিভিন্ন নামে সভা-সেমিনারের আয়োজন করে হিযবুত তাওহীদ। সরকারি বিভিন্ন দফতরসহ গণমাধ্যম অফিসে তারা তাদের প্রচারপত্রও বিলি করছে। এমনকি সরকারি দলের নেতাকর্মীদেরও নিজেদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর হিযবুত তাওহীদ বা এর অঙ্গীভূত কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দেয় সরকার। একই সঙ্গে হিযবুত তাওহীদ সম্পৃক্ত দৈনিক বজ্রশক্তি ও দেশেরপত্র না পড়ার কথাও বলা হয়। এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই চিঠির কপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব এবং ছয় বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানো ওই চিঠির বিষয়বস্তুতে বলা হয়, কালোতালিকাভুক্ত সংগঠন হিযবুত তাওহীদের প্রচারণার নতুন কৌশলের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির স্মারকলিপি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আপনার মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এবং এর আওতাধীন অধিদফতর বা সংস্থা বা দফতরগুলোর কর্মকর্তাদের হিযবুত তাওহীদ বা এর অঙ্গীভূত কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার নির্দেশনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে হিযবুত তাওহীদের অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠানের প্রচারকৃত দৈনিক বজ্রকণ্ঠ ও দেশেরপত্র না পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে কালোতালিকাভুক্ত সংগঠন ‘হিযবুত তাওহীদ’ বা এর কোনো অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে যোগ না দিতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পাঠানো একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের নির্বাহীদের এ নির্দেশ দেয়।

এ ব্যাপারে হিযবুত তাওহীদের প্রচারপত্র-সংক্রান্ত বই বিক্রেতারা বলেছেন, সংগঠনটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে গণমাধ্যম। হিযবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ বা কালোতালিকাভুক্ত সংগঠন নয়, এ সংগঠন ইসলামের জন্য কাজ করছে।

জানতে চাইলে নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের চিফ অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, হিযবুত তাওহীদসহ কালোতালিকাভুক্ত একাধিক জঙ্গি সংগঠনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এ সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধরাও হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া এসব সংগঠন ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

প্রতীক/শব্দ- ৬১৯

"