যমুনা ব্রহ্মপুত্র দুধকুমার ঘাঘটের পানি বাড়ছে

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ঘাঘট, ও যমুনা নদীর পানি বেড়েছে। এসব নদ-নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টÑ

কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্র আর দুধকুমার অববাহিকায় কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার ৫৬টি ইউনিয়নের সাড়ে চারশ’ গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জেলা প্রশাসন বলেছে, বন্যাকবলিতদের জন্য ফ্লাড শেল্টারসহ ৪৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৭০ টন চাল, ৪ লাখ টাকা জিআর ক্যাশ, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং শিশু ও গোখাদ্যের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাজীবপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে পানি প্রবেশ করেছে। প্লাবিত হয়েছে ওই উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন। ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানিতে প্লাবিত হয়েছে উলিপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ। এ উপজেলার ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার হাতিয়া, বুড়াবুড়ি, বেগমগঞ্জ ও সাহেবের আলগা ইউনিয়ন চরম ক্ষতিগ্রস্ত বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল কাদের।

এদিকে ধরলার পানিতে সদর উপজেলায় হলোখানা, ভেলাকোপা ও পাঁচগাছী ইউনিয়নের বেশির ভাগ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে নাগেশ^রী, রাজারহাট ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বেশকিছু ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবার।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলা নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেয়ে সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গাইবান্ধা : ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট নদীর পানি বেড়েছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ৯২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কবলিত চারটি উপজেলার ২ হাজার ২১ হেক্টর জমির পাট, আমন বীজতলা, আউশ ধান এবং বিভিন্ন শাকসবজির খেত তলিয়ে গেছে। এদিকে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের ভাষারপাড়াসংলগ্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চুঁইয়ে পানি অপর পাড়ে যাচ্ছে। এতে বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

জামালপুর : জামালপুরে গতকাল বুধবার দুপুরে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি বিপৎসীমার ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় জেলার সাতটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৪ লাখ মানুষ। খোলা হয়েছে ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র। ২৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে দুর্গত এলাকায়।

জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টি ইউনিয়ন বন্যায় কবলিত। বুধবার দুপুরে দেওয়াগঞ্জ পৌরসভার বেশিরভাগ এলাকায় পানি উঠেছে। সড়কগুলো তিন থেকে চার ফুট পানির নিচে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে উপজেলা পরিষদ ও ভূমি অফিসসহ কয়েকটি সরকারি দফতর।

ইসলামপুর : জামালপুরের ইসলামপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয় দফার বন্যায় জেলার সাতটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ। খোলা হয়েছে ৫১টি আশ্রয়কেন্দ্র। ৩৯টি মেডিকেল টিম কাজ করছে বন্যাদুর্গত এলাকায়।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী জানান, জেলায় বন্যাকবলিত এলাকায় এখন পর্যন্ত ৩১০ টক জিআর চাল ও নগদ ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং শুকনো খাবার ৪ হাজার প্যাকেট এবং গো-খাদ্য বাবদ দুই লাখ টাকা বিতরণ করা হচ্ছে।

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) : জামালপুরের বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া, মেরুরচর, বগারচর, নিলক্ষিয়া ও বকশীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বন্যার কবলে পড়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সাধুরপাড়া ইউনিয়নের মদনেরচর, বিলেরপাড়, ডেরুর বিল, ঠান্ডারবন্দর, চরগাজীরপাড়া, উত্তর আউচাকান্দি, কতুবেরচর, বাংগালপাড়া, নয়াবাড়ী, চরকামালের বার্ত্তী, চরআইরমারী গ্রাম, মেরুরচর ইউনিয়নের মাইছানিরচর, ভাটি কলকিহারা, উজান কলকিহারা, পূর্ব কলকিহারা, চিনারচর, বাঘাডুবি, খেওয়ারচর, ঘুঘরাকান্দি ও ফকিরপাড়া, বগারচর ইউনিয়নের আলীরপাড়া, টালিয়াপাড়া, বালুরচর, পেরিরচর, গোপালপুর, বগারচরসহ ৪০টি গ্রামে পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয়েছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) : দ্বিতীয় দফা বন্যায় কলমাকান্দায় ৩ হাজার ৩০০ পুকুরের মধ্যে ২ হাজার ৪০০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। রংছাতি ইউনিয়নের রায়পুর, বরকান্দা, কৃষ্ণপুর, এলাকার আক্কাস আলী মেম্বার ও আল মামুন জানান, যুবকেরা মৎস্য চাষের দিকে ঝুঁকেছিল। বন্যায় তারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আটটি ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার টন মাছের ক্ষতি হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ উপজেলায় মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৪ হাজার ৩০০ হেক্টর। তাতে মাছ উৎপাদন হয় সাড়ে ১২ হাজার টন। উপজেলায় চাহিদা প্রায় ৮ হাজার টন। আর ৪ হাজার টন উদ্বৃত্ত।

নওগাঁ : নওগাঁর রানীনগরে ছোট যমুনা নদীর নান্দাইবাড়ি-কৃষ্ণপুর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধটি ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুরের মাছ। প্লাবিত হয়েঝে আউশ ও আমন ধানের বীজতলা ও সবজির খেত। মঙ্গলবার বাঁধটি ভেঙে পানি প্রবেশ করছে।

গোনা ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসনাত খাঁন হাসান বলেন, ‘আশির দশকে স্থানীয়রা চলাচলের জন্য ছোট যমুনা নদীর তীরের পাশ দিয়ে নির্মাণ করেন নান্দাইবাড়ি-কৃষ্ণপুর গ্রামীণ রাস্তাটি। কালের আর্বতে নদী ভাঙতে ভাঙতে রাস্তাটি বেড়িবাঁধে পরিণত হয়। বেড়িবাঁধটিকে সংস্কার কিংবা মেরামত না করায় তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পরিণত হয়। তাই বর্ষা মৌসুমে ছোট যমুনা নদীতে পানি এলেই নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় দুই উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষকে।

ফুলগাজী (ফেনী) : ফেনীর মুহুরি নদীর ৮ স্থানে বাঁধ ভেঙে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল বুধবার ফুলগাজী ও পরশুরামের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। তিনি ভাঙনকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

কবির বিন আনোয়ার জানান, নদীটা দেখতে এত বেশি চওড়া মনে হচ্ছে না। খুব বেশি পানির চাপ হলে নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। যে ব্রিজ নদীর ওপর করা হয়েছে সেটি ভাঙতে হবে, বাঁধটি পুরোই সংস্কার করতে হবে, এরই মধ্যে ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমানার প্রায় ৯২ কিলোমিটার নদী খনন করা হবে। এ বছরের শেষের দিকে কাজ শুরু হবে।

 

"