করোনায় সিনেমা শিল্পে মহাদুর্দিন

* হলের সংখ্যা এখন শয়ের নিচে * অস্তিত্ব নিয়েই সংশয়

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশীয় সিনেমার দুর্দিন বহু আগের। এখন আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে জেঁকে বসেছে প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ ভাইরাস। বলা যায়, চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় হচ্ছে ২০২০ সাল। কারণ একদিকে সিনেমা হলের সংখ্যা ১০ বছরে হাজার থেকে এখন শয়ের নিচে নেমে এসেছে। এদিকে, করোনায় টানা চার মাস ধরে সব সিনেমা হল বন্ধ। নতুন কোনো সিনেমার শুটিংও হচ্ছে না। রোজার ঈদেও মুক্তি পায়নি কোনো ছবি। অথচ এই বছরেই বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। আসছে কোরবানি ঈদেও সিনেমা হল খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই অবস্থায় সরকারি প্রণোদনা ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় আছে সংশ্লিষ্টদের। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ও মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, এমনিতেই চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো নয় তার মধ্যে এখন আবার করোনার প্রকোপ। এখন সিনেমা হল খুললেও ভালো মানের কিছু দিতে হবে। তারপরও দর্শক আসবে কিনা বলতে পারছি না।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলেন, গত ৭ জুন আমরা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছি। তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে মৌখিকভাবে বলেন, সিনেমা হল খুলতে তারা আগ্রহী নন। সরকারের পক্ষ থেকে নাকি কোনো নির্দেশ পাননি। আর একজন প্রযোজক সিনেমা হলে দর্শক না পেলে কেনো সিনেমা মুক্তি দেবেন? এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রযোজকরা সবাই মরে যাবে। কারণ অনেকের অনেক টাকা এখানে লগ্নি করা রয়েছে।

অভিনেতা ও প্রযোজক শাকিব খান বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখা এ মুহূর্তে একেবারে অসম্ভব। আমার মনে হয় না এই সময়ে দর্শক হলে আসবেন। মানুষ বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখে। এই সময়ে সিনেমা হলে খুব বেশি দর্শক হবে কি? আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম বলেন, এই সময়ে যদি সিনেমা হল খোলে তাহলে দর্শক খুব কম আসবে। আরেকটু সময় নেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে একটি সিট থেকে আরেকটি সিটের দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের দেশে কি সম্ভব? ঠিক এ মুহূর্তে হলে যাওয়াটা নিরাপদ হবে না। আমাদের উচিত আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করা।

জানা গেছে, একগুচ্ছ ছবি মুক্তির কথা ছিল এবার ঈদে। সানী সানোয়ার ও ফয়সাল আহমেদের ‘মিশন এক্সট্রিম’, দীপঙ্কর দীপনের ‘অপারেশন সুন্দরবন’সহ বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল এবার ঈদে। এবার ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ঢালিউডের জনপ্রিয় জুটি অনন্ত জলিল ও বর্ষা অভিনীত দেশের সবচেয়ে বড় বাজেটের অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী সিনেমা ‘দিন দ্য ডে’। ১০০ কোটি টাকা বাজেটের এ ছবিটি নির্মিত হচ্ছে ইরানের মুর্তুজা আতাশ জমজম এবং বাংলাদেশের প্রযোজক অনন্ত জলিলের ‘এজে’ ব্যানারে। সম্প্রতি ছবিটির ট্রেলার প্রকাশিত হয়েছে। এবার বলিউডের সমতুল্য দুর্দান্ত অ্যাকশন ও বিজিএম নিয়ে ট্রেলারেই চমকে দিয়েছেন অনন্ত জলিল। এ ছবিগুলো আদৌ মুক্তি পাবে কিনা কেউ জানে না।

এছাড়া মুক্তির অপেক্ষায় ছিল দেবাশীষ বিশ্বাসের ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২’, মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’, চয়নিকা চৌধুরীর ‘বিশ্বসুন্দরী’ সিনেমা। এই ছবিগুলোর মুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়া ছবির মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ভিত্তিক সিনেমা ‘বঙ্গবন্ধু’। ছবিটির শুটিং শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৭ মার্চ। করোনার কারণে সেটির নির্মাণকাজ পিছিয়েছেন ভারতীয় নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল। ১৫ মার্চ থেকে নেপালে ‘কানামাছি’ সিনেমার শুটিং শুরুর কথা ছিল সেটিও স্থগিত। আরো বন্ধ হয়ে গেছে নেয়ামুলের ‘গাঙচিল’, ‘জ্যাম’, রায়হান রাফীর ‘স্বপ্নবাজী’, সৈকত নাসিরের ‘ক্যাসিনো’, সাইফ চন্দনের ‘ওস্তাদ’, ‘মন্ত্র’, ‘কাপ্তান’ ও ‘কয়লা’, দীপঙ্কর দীপনের ‘অপারেশন সুন্দরবন’সহ কয়েকটি ছবির শুটিং। এসব ছবির সেট নির্মাণসহ অনেক কাজই আগে শেষ হয়েছিল। করোনাভাইরাসের কারণে দেশীয় চলচ্চিত্র ব্যবসা এক প্রকার ভেঙে পড়েছে বলা যায়। দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খোঁজ পাওয়ার আগে মুক্তি পাওয়া দুটি বিগ বাজেটের ছবি ‘বীর’ ও ‘শাহেনশাহ’ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে মুক্তি পাওয়া কলকাতা থেকে আমদানি করা আরেকটি ছবি ‘রবিবার’ আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক গুনেছে।

সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে এবং আগামীতে এর পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা।

মিরপুরের সনি সিনেমা হলের কর্ণধার মোহাম্মদ হোসেনসহ বেশ ক’টি সিনেমা হল ও সিনেপ্লেক্সের কর্ণধার জানান, সিনেমা হল বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ, পানিসহ নানা বিল, ট্যাক্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত গুনতে হচ্ছে। এতে লোকসানের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে চলচ্চিত্রশিল্প। প্রযোজক, পরিচালক, টেকনিশিয়ানরা কার্যত বেকার এখন। এই অনিশ্চয়তা চরম আর্থিক সঙ্কটের মুখে ফেলে দেবে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে মনে করেন খোরশেদ আলম খসরু। তিনি বলেন, এটার ধকল প্রকৃতপক্ষে থাকবে দীর্ঘদিন। যারা সিনেমা দেখতে যাবে ওদের মনে কিন্তু একটা আতঙ্ক ঢুকে গেছে। সবার মাঝে এখন করোনা আতঙ্ক আছে। আমি জানি না সিনেমায় কতকাল আমরা এটা বহন করব। সব শিল্প প্রতিষ্ঠান হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে, এটা কেটে উঠবে। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রের এই ধকল কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যাবে। সেই পর্যন্ত চলচ্চিত্র আসলে টিকে থাকবে কিনা সেটা একটা বিষয়। এটাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এই সেক্টরে হল মালিকদের প্রডিউসারদের প্রণোদনা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে এ ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকবে না।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক চিত্রনায়ক জায়েদ খান বলেন, যখন একটা দিকে দুর্যোগ শুরু হয় তখন কিন্তু সবদিক থেকেই শুরু হয়। দেশের অর্থনৈতিক দিক যখন বাধাগ্রস্ত হয় তখন ছোট ছোট অংশ যেমন সিনেমা, নাটক, গান, খেলাধুলা বা বিভিন্ন শিল্প সব কিছুতেই আঘাত লাগে।

 

"