বন্যায় ভাঙছে নদী বাড়ছে দীর্ঘশ্বাস

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

অব্যাহত নদীভাঙনে বাড়ছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস। দেশে নিত্যনতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বাড়ছে বানভাসী লোকের সংখ্যা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে ১০ জেলার পানিবন্দি ও ঘরহারা মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। জেলাগুলো হচ্ছে- কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও পটুয়াখালী। বিস্তারিত জানিয়েছেন প্রতিদিনের সংবাদের প্রতিনিধিরা।

কুড়িগ্রাম : সদর উপজেলার চরযাত্রাপুরে একটি বাঁধের ওপর পলিথিনে মোড়ানো আনুমানিক ৫ ফুট প্রশস্ত ও ৯ ফুট দৈর্ঘ্যরে ঝুপড়ি ঘরে ১১ দিন ধরে সংসার পেতেছেন বানভাসি সাহেরা বেগম। তিনিসহ পরিবারে সদস্য পাঁচ জন। তার সঙ্গে একই ঝুপড়িতে উঠেছেন তার ছোট বোন আহেনা বেগম ও তার স্বামী আবদুল জব্বার। তাদের বাড়িতে বন্যার পানি বুক সমান। পানি কিছুটা কমলেও এখনো ঘরের ভেতরে পানি রয়েছে। কবে নাগাদ সাহেরা, আহেনারা পরিবার নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারবেন তা জানেন না। ঝুপড়ি-ঘরে সংসার জীবন খুবই কষ্টের। কিন্তু বন্যার পানি তাদের বাধ্য করেছে এ কষ্টের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে।

সাহেরা বেগম জানালেন, এটা জীবনে নতুন কিছু নয়। অনেক বছর ধরে বাঁধের ওপর সংসার পাতার ঘটনা জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলায় পানি বাড়লেই বন্যা হয়। ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিতে হয় বাঁধ ও সরকারি রাস্তায়। গেল বছরগুলোতেও এমন অভিজ্ঞতার বিশদ বর্ণনা রয়েছে তার কাছে

বানভাসি আহেনা বেগম জানালেন, তিনি বড় বোনের ঝুপড়িতেই থাকছেন। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না কারোই। অস্থায়ী ঝুপড়িতে থাকতে হবে বন্যার পানি ঘর থেকে না নামা পর্যন্ত। প্রতি বছর বন্যা আসলে বাঁধতে হয় ঝুপড়ি ঘর। সেখানে থাকতে হয় পানি না নামা পর্যন্ত।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি কমে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব অঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পাট, ভুট্টা শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গতকাল সকালে যমুনা নদীতে পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি সমতল ১৩ দশমিক ৪৫ মিটার রেকর্ড করা হয়।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী ও কাজীপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বেলকুচি উপজেলা বড়ধুল ইউনিয়ন, এনায়েতপুরের বাহ্মণগ্রাম, কাজীপুরের নাটুয়াপাড়া, চরগিরিস, টেকানি ইউনিয়নসহ চৌহালী ও শাহজাদপুরে দফায় দফায় নদীভাঙনে বিলীন হতে চলেছে বসতবাড়িসহ ফসলি জমি, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিরাজগঞ্জ পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম জানান, ভাঙনরোধে নতুন পরিকল্পানা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্যায় ঝুঁকিপূর্র্ণ উপজেলায় ১২৫ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

জামালপুর : উজানে যমুনার নদীর পানি কমলেও ভাটি অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র ও ঝিনাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তিত রয়েছে। বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি ২৫ সেন্টিমিটার কমে গতকাল সকালে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকায় ৭ উপজেলার ৪৯ ইউনিয়নের ৩৯১ গ্রামের ও ৮ পৌরসভার ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৯৭ জন পানিবন্দি। এছ্ড়াা ৬ হাজার ৬৬২টি ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়েছে।

টাঙ্গাইল : বন্যা পরিস্থিতি অপরর্তীত রয়েছে। নদীভাঙনের কবলে পড়ছে যমুনা নদী পাড়ের মানুষ। জেলার ভূঞাপুর, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুরে এরই মধ্যে শতাধকি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। ভাঙনকবলতি এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সব রকমের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

মাদারীপুর : শিবচরের পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এরই মধ্যে নতুন করে শিবচরের তিন ইউনিয়নের অন্তত কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বন্দরখোলা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর পাশের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, হাটবাজারসহ বহু স্থাপনা। এরই মধ্যে পদ্মা নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ জনপদ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ৫ শতাধিক মানুষ ও নদীভাঙনের ফলে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

পটুয়াখালী : পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের পানি আর টানা বৃষ্টিতে পৌরশহরসহ জেলার অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিঘিœত হচ্ছে। জরুরি কাজে ঘর থেকে বের হয়ে অনেকেই আটকে পড়েছে। শহরে যানচলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। জেলায় ৯০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে গলাচিপা-পটুয়াখালী সড়কের হরিদেবপুর ফেরিঘাট ডুবে যাওয়ায় ৫ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কপথে গলাচিপার সঙ্গে সারা দেশের চার ঘণ্টা যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

অপরদিকে জেলার কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া, নিজামপুর গ্রাম রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ, চরআন্ডাসহ অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদিকে পটুয়াখালী পৌরসভার নবাবপাড়া, জুবিলী স্কুল সড়ক, পুরাতন হাসপাতাল সড়ক, মহিলা কলেজ সড়ক, সিভিল সার্জন অফিস, সড়ক ও জনপথ অফিসসহ বিভিন্ন সড়ক পাড়া মহল্লা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। রাত পর্যন্ত বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি জমে চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অফিসার বশির আহমেদ জানান, পটুয়াখালী জেলায় গত রোববার রাত ৯টা থেকে গতকাল দুপুর ১টা পর্যন্ত ৯০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

 

"