অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরা

* অনলাইন শিক্ষায় বঞ্চিত নিম্নবিত্ত ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা * সেশনজটের আশঙ্কায় এসএসসি উত্তীর্ণ ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনার কারণে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে পাঠদানে কমবেশি উদ্যোগ চলছে। কিন্তু দেশের সর্বত্র অনলাইনে পড়াশোনার পরিকাঠামো কতটা আছে, বিশেষত গ্রাম বা মফস্বলে ইন্টারনেট পরিষেবা কতটা ভালো, স্মার্টফোনইবা কজন শিক্ষার্থীর হাতে আছেÑ এসব প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ক্লাস চলছে। বাড়ির কাজও দেওয়া হচ্ছে। সংসদ টিভির মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের সব প্রান্তের সবাই কি অনলাইন পাঠের সুযোগ পাচ্ছে? বৈদ্যুতিক পরিকাঠামোর অভাবে বা আর্থিক কারণে যাদের হাতে সাইবার প্রযুক্তি নেই, এ ব্যবস্থায় তারা বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়ার কী বন্দোবস্ত হচ্ছে? এদিকে করোনা সংক্রমণের ভয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ভর্তির সময়সীমা ছাড়া অন্যান্য নিয়ম বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। অনেকে স্বাগত জানালেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্থবিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা কোনো কোনো শিক্ষাবিদের। করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের মতো এইচএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত সময় অনুষ্ঠিত হয়নি। এইচএসসি পরীক্ষা কবে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানালেন, করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। তবে যখনই পরীক্ষা নেওয়া হবে, তার আগে দুই সপ্তাহ সময় পাবেন শিক্ষার্থীরা। ফলে করোনার কারণে এসএসসি পাস করা এ শিক্ষার্থীরা এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৬ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এর ফলে পিছিয়ে যায় এইচএসসি পরীক্ষাও। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়-গুলোয় দেখা দিচ্ছে সেশনজটের আশঙ্কা। শিক্ষা কার্যক্রম যাতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, সে আশঙ্কা থেকে প্রথমে মাধ্যমিক স্কুলের জন্য সংসদ টিভিতে ক্লাস পরিচালনা শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের উদ্যোগে শুরু হয় প্রাথমিকের ক্লাস। এক মাস ধরে চলছে এ শিক্ষা কার্যক্রম। জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা মাথায় রেখেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার তাগাদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। করোনাভাইরাস মহামারিতে চলমান অনলাইন ক্লাসের সুবিধা পাচ্ছে স্মার্টফোন থাকা উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। আর ক্লাস করা থেকে বঞ্চিত হয়ে হতাশায় ভুগছে নি¤œবিত্ত কিংবা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারের শিক্ষার্থীরা। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অ্যান্ড্রয়েড ফোন না থাকার কারণে যারা অনলাইন ক্লাসের সুবিধা পাচ্ছে না, তাদের জন্য বাসায় হ্যান্ড নোট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

করোনাভাইরাসের এ সময়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সরকার সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান কর্মসূচি চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ফেসবুক ও ইউটিউবে নেওয়া হচ্ছে ক্লাস। রাজধানীর বাসাবোর এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রহিমা বেগম বলেন, ‘অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানোই কষ্টকর। এমনিতে সন্তানদের কোচিংয়ে দেওয়ার মতো টাকা থাকে না। আর অনলাইনে ক্লাস তো দূরের কথা। যারা ধনী তারা ওইসব ক্লাস করুক।’

পূর্ব বাসাবো কদমতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী জানায়, তারা অনলাইন ক্লাসের কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। সংসদ টিভি দেখারই সুযোগ নেই তাদের। সেখানে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনার সামর্থ্য কোথায় পাবে তাদের পরিবার।

ওই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক আবদুল মান্নান বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। তা না হলে দারিদ্র্যসীমার নিচের শিক্ষার্থীরা এ ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শাহনাজ আনজুম বলেন, ‘আমরাও অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছি। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন নেই, কিছু শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন থাকলেও অর্থাভাবে ইন্টারনেট সেবা নেই। ক্লাসে আই কন্টাক্টে শিক্ষার্থীকে আগ্রহী করা হয়। কিন্তু এ গতানুগতিক অনলাইন শিক্ষায় আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে অনলাইন শিক্ষার সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে এ সংকটকালে অনলাইন কার্যক্রম একটা ভালো উদ্যোগ।’

এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এক মাস আগে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। তাই সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পরই স্কুল-কলেজে যাবে ছাত্রছাত্রীরা। যে সংকট শুরু হয়েছে তাতে আমরা বলতে পারছি না যে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তা জানলে সে হিসেবে ব্যবস্থা নিতাম।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনিশ্চয়তা থাকায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানো যাচ্ছে না। যদি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তবে টানা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেভাবে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, এটি চলমান থাকবে। আরো কীভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা যায়, সেসব নিয়েও ভাবছি আমরা।’

এখন অনলাইন পাঠদানের চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘অনলাইন এডুকেশনে অভ্যস্ত নন আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া এ ব্যাপারে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণও নেই।’ গত শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও মাইক্রো গর্ভন্যান্স রিচার্স ইনেশিয়েটিভের যৌথ উদ্যোগে এক ওয়েবিনারে এ কথা বলেন তিনি।

করোনায় উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি নিয়ে সংশয়

চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় ২০ লাখ ৪৭ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী। এ বছর অন্তত ১৬ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেবে। করোনা মহামারির এ সময়ে ফল প্রকাশ হলেও ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ড মনে করছে, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতেই হবে।

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, ‘ভর্তির সময় আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখতে হয়। কমপক্ষে ২০-২৫ লাখ মানুষের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আমরা ভর্তি কার্যক্রম শুরু করব।’

সংকটে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও

করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের মতো এইচএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত সময় অনুষ্ঠিত হয়নি। এইচএসসি পরীক্ষা কবে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানালেন, করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। তবে যখনই পরীক্ষা নেওয়া হবে, তার আগে দুই সপ্তাহ সময় পাবেন শিক্ষার্থীরা।

নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও রোববার শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হয়। এমন অবস্থায় সামনের এইচএসসি পরীক্ষা কবে নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তবে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত রোববার সকালে ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ২০২০ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এবারের এইচএসসি পরীক্ষা ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে রেখেছিলাম। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সে পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয়নি। কারণ এখানে ব্যাপক পরিমাণ শিক্ষার্থী, পুরোপুরি গণপরিবহন চালু হতে হবে।’

দীপু মনি বলেন, ‘পরীক্ষা কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব না। তাহলে আমাদের পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা বহু গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। এসব কিছু না করতে পারলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যাপকভাবে থেকে যাবে। কোনোভাবেই এ ঝুঁকি এ মুহূর্তে নেওয়া সম্ভব নয় বলে আমরা মনি করি।’

শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, ‘সে কারণে করোনা পরিস্থিতি আরো অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত আমরা এইচএসসি পরীক্ষা নিতে পারছি না। যখনই আমরা মনে করব, পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছে, তখনই অন্ততপক্ষে দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে সায় দিলেও শিক্ষা কার্যক্রম দিনের পর দিন বন্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ক্ষতির আশঙ্কা শিক্ষাবিদদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এ মুহূর্তে শিক্ষার্থী বা তাদের পরিবারের পক্ষে কলেজে যাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া অনলাইন সুবিধাও সর্বত্র নেই। সুতরাং ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য যেন না হয়। তবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে আর্থিক ছাড়ের পাশাপাশি কয়েকটি ধাপে ভর্তির সুযোগ রাখার পরামর্শ তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, অনেক পরিবারের হাতে অর্থ থাকবে না। মোবাইলে ইন্টারনেট কেনার পয়সা থাকবে না। যদি সত্যি সত্যি অনেকে আবেদন করতে না পারে, অনেক মেধাবী বাদ পড়ে যেতে পারে।

 

"