প্রথম দিনে রাজধানীর গণপরিবহনের চিত্র

বাড়তি ভাড়া আদায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত

* সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই লেগুনা-ইজিবাইকে * হচ্ছে না মনিটরিং * অধিকাংশ * পরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটাতে দেখা যায়নি

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২০, ০০:০০

হাসান ইমন

টানা দুই মাস সময়ের বেশি দিন ঢাকার গণপরিবহন বন্ধ থাকার পর গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে পরিবহন চলাচল। সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দিলেও পুরাপুরি পালন করতে দেখা যায়নি পরিবহন চালকদের। কিছু পরিবহনে জীবাণুনাশক ওষুধ ছিটানো হলেও অধিকাংশ পরিবহন তা করেনি। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি পালন হচ্ছে কিনা সেটি দেখার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো মনিটরিংও চোখে পড়েনি। তবে বাসের আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনাগুলো মানা হয়েছে। রামপুরা, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এদিকে সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না লেগুনা ও ইজিবাইকে। একজনের অন্যজনের গা ঘেঁষে বসা, মাস্ক-হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার না করার পুরোনা চিত্র দেখা গেছে এই দুটি গণপরিবহনে।

সকালে সরেজমিন রামপুরা থেকে গণপরিবহনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশ্যে বাসে যাত্রীদের উঠতে দেখা গেছে। হেলপাররা আগের মতো জোর করে টেনে টেনে যাত্রী তুলছেন। এ সময় কোনো পরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটাতে দেখা যায়নি। তবে পরিবহনগুলো বের হওয়ার আগেই জীবাণুমুক্ত করে রাখা হয়েছে বলে দাবি পরিবহন শ্রমিকদের। জানতে চাইলে আলিপ পরিবহনের চালকের সহযোগী কাদের বলেন, গতকালই আমরা আমাদের সব বাস জীবাণুমুক্ত করেছি। এখনো হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাইনি। তাই সেটা নিয়ে বের হতে পারিনি। তবে যাত্রীদের আমরা ধীরে বাসে উঠাচ্ছি এবং নামাচ্ছি। তিনি নিশ্চিত করেন পাশাপাশি দুটি সিটে কাউকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না।

মহাখালীর নাবিস্কো এলাকায়ও গণপরিবহন চলতে দেখা গেছে। তবে যাত্রী সংখ্যা কম। এই এলাকার পরিবহন শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষও খুব বেশি পরিবহনে উঠছে না। যাদের একান্ত প্রয়োজন তারাই গণপরিবহন ব্যবহার করছেন।

বলাকা পরিবহনের চালক কবির মিয়া বলেন, যাত্রী কম। আমরাও মানুষকে ডাকাডাকি করে পরিবহনে তুলছি না। মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে অনুরোধ করছি। বাসের ফাঁকা ফাঁকা স্থানে বসতে অনুরোধ করছি। যাদের মুখে মাস্ক নেই তাদের উঠতে দিচ্ছি না।’ বাসে উঠার সময় যাত্রীদের কেনও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে না এমন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনো মালিক থেকে সেটা বুঝে পাইনি।

তবে মিরপুর আনসার ক্যাম্প থেকে মোহাম্মদপুর বছিলা রুটে চলাচলকারী প্রজাপতি পরিবহনের কয়েকটি বাসে দেখা যায় নিয়ম মেনে যাত্রী উঠানো ও জীবাণুনাশক স্প্রে দিতে।

সবুজ নামে এক যাত্রী বলেন, ভয়ে উঠতে মন চায় না। কিন্তু নিজস্ব পরিবহন নেই যেতে হবে দূরের পথ, হাঁটার অবস্থাও নেই গরমে। যাত্রী যেহেতু কম, বাসগুলো যদি নিয়ম মেনে ধীরে সুস্থে যাত্রী উঠানামা করতো একটু চলাচল করে স্বস্তি পেতাম।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যেই অফিস খোলা ও গণপরিবহন সীমিত আকারে চলাচলের সরকারি সিদ্ধান্তের পর বাসের ভাড়া ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিআরটিএর ওই সুপারিশকে গণবিরোধী উল্লেখ করে চলা সমালোচনার মধ্যেই গত রোববার বিআরটিএ এ সুপারিশের মাত্র ২০ শতাংশ কমিয়ে গণপরিবহনের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার বর্ধিত ভাড়ায় রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি অনেক ভালো। যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি পালনের চেষ্টা চলছে। দূরপাল্লার গাড়িগুলোও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো হচ্ছে। আমি এবং আমাদের মালিকরা সবস্থানেই তদারকি করছেন।

তিনি আরো বলেন, মহাখালীসহ বিভিন্ন টার্মিনালে জীবাণুমুক্ত টানেল স্থাপন করা হয়েছে। যাত্রীদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যারা স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করবে তাদের গাড়ি রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না।

সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই লেগুনা-ইজিবাইকে : ঝুঁকিপূর্ণ গণপরিবহনের তালিকায় রয়েছে লেগুনা। দীর্ঘ ছুটির পর স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সে দূরত্ব মানা হচ্ছে না লেগুনায়।

প্রতিটি লেগুনায় চালকের পাশের আসনে দুজন। পেছনে দিকে দুই পাশে ছয় জন করে মোট ১২ জন যাত্রী পরিবহন করা হয়। সামাজিক দূরত্ব মেনে যাত্রী পরিবহন করতে বলা হলে প্রতি ছয়জনের জায়গায় যাত্রী নেওয়া হচ্ছে চারজন করে। এতে প্রতিজনের মধ্যে এক ফুটেরও কম দূরত্ব থাকছে। আবার দুই পাশের যাত্রীরা বসছেন মুখোমুখি। ফলে স্বাস্থ্যবিধি বা সামাজিক দূরত্বের কিছুই মানা হচ্ছে না।

আবার যাত্রীর মধ্যেও অসচেতনায় ঘাটতি নেই। শ্যামলি থেকে মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান রুটে চলাচলকারী কয়েকটি লেগুনায় মাস্ক ছাড়া ছাড়া যাত্রী চলাচল করতে দেখা গেছে। হাতেগোনা দুই-একজনের হাতে হ্যান্ড গ্লাভস থাকলেও বাকিদের হাতে নেই।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে পরিবহনটির একজন চালক বলেন, ‘আমরাও জানি সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি; কিন্তুকী করার আছে। লেগুনার বডিই ও ছয় ফুটের। এর মধ্যে তিন ফুট দূরে দূরে লোক বসায় কেমনে? ওই হিসাবে যাত্রী নিতে গেলে এক ট্রিপে চারজনের বেশি যাত্রী নেওয়া যায় না।’ একই চিত্র গাবতলি থেকে সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, জিগাতলা, মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লেগুনাগুলোতেও।

এছাড়া এতদিন লকডাউন চললেও তার মধ্যেই মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ রুটে চলাচল করেছে ইজিবাইক। সামাজিক দূরত্ব না মেনে চালকের আসনের দুই পাশে দুজন। পেছনে চার আসনে মুখোমুখি চারজন যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে এই পরিবহনটি। একইভাবে যাত্রী পরিবহন করছে উত্তরখান, দক্ষিণখান এলাকায় চলাচলকারী ইজিবাইকগুলো।

 

"