করোনা-ইপিসেন্টার হতে চলছে পশ্চিমবঙ্গসহ পূর্ব ভারত

প্রকাশ : ৩১ মে ২০২০, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

ভারতে পরবর্তী কোভিড হটস্পট হিসেবে পশ্চিমবঙ্গসহ পূর্ব ভারতকে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্র। গোটা দেশের মোট ১৪৫টি জেলাকে পরবর্তী কোভিড হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্র। এই জেলাগুলোর বেশিরভাগই গ্রামীণ ভারতের অন্তর্গত। গত তিন সপ্তাহে এই জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণের হার অত্যন্ত বেড়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সচিব রাজীব গৌবা জানিয়েছেন যে কনেটেইনমেন্ট ব্যবস্থা ঠিকমতো না নেওয়া হলে এই জেলাগুলো করোনাভাইরাসের এপিসেন্টার হয়ে উঠতে পারে। পরিযায়ী শ্রমিকরা ফেরার ফলে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশার মতো রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বগামী। করোনা সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়বে বলে ১২টি রাজ্যকে সতর্ক করা হয়েছে। পরিযায়ীরা ফেরার ফলে ত্রিপুরা এবং মণিপুরের মতো রাজ্যে আগের চেয়ে বেড়েছে করোনা সংক্রমণের হার। দেশে এখনো পর্যন্ত করোনা সংক্রমণের হারে এগিয়ে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, গুজরাট, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্য। কিন্তু আগামী দিনে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো করোনা হটস্পট হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ১৫ দিনে এসব রাজ্যে বেড়েছে করোনা সংক্রমণের হার।

এদিকে করোনাভাইরাসের সঙ্কটকে সঙ্গে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হয়ে গেল। এই পরিস্থিতিতে তিনি জাতির উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে নিজের বার্তা দিয়েছেন। গত বছর অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত অগ্রগতির দিকে এগোনোর চেষ্টা করা হলেও হঠাৎ করেই সবকিছুতে বাদ সেধেছে করোনাভাইরাস নামের মারাত্মক সংক্রামক রোগটি। দেশকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। আর এই করোনা সংকটের ফলে সাংঘাতিকভাবে ভুগতে হচ্ছে দেশের পরিযায়ী শ্রমিকদের, দেশবাসীকে এমনটাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে শুধু পরিযায়ীরাই নন, এই চরম সংকটে গোটা দেশই ভুক্তভোগী। কিন্তু হতাশার বার্তার মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বিশ্বাস করেন, ভারত এই অবস্থা থেকে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং গোটা বিশ্বকে অবাক করে দেবে। নিজের চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, এই ধরনের মারাত্মক সংকটে কখনোই এমন দাবি করা যায় না যে কেউ কোনো অসুবিধা বা সমস্যায় পড়েননি। আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষজন, পরিযায়ী শ্রমিক, ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এবং কারিগর, হকারসহ দেশের সব ধরনের মানুষই প্রচ- দুর্ভোগ সহ্য করছেন। তবে আমাদের এদিকে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যে আমাদের এসব সমস্যাগুলো যেন কোনোভাবেই বিপর্যয়ের আকার না নেয়, এ কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

গণতন্ত্রের সম্মিলিত শক্তি তাকে ফিরিয়ে এনেছিল দ্বিতীয় মেয়াদে, এমন কথা আরো একবার জোরগলায় বলেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তার সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বর্ষপূর্তিতে নরেন্দ্র মোদি দেশের জনতা জনার্দনের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠিতে তিনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বর্তমানে যে যে চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে দেশ যাচ্ছে, সবকিছু নিয়েই কথা বলেছেন। করোনাভাইরাস শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। এই ভয়াবহ সংকটের সময় ভারত রীতিমতো অকুতোভয় হয়ে লড়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তবে করোনা পরিস্থিতি এবং তার জেরে হওয়া লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে দেশের দিন আনি দিন খাই মানুষদের, একবাক্যে এ কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। তবে জীবিকা হারিয়ে জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে ওঠা এই দিন মজুর এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা কাটাতে তৎপর কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমন আশ্বাস দিয়েছেন যে তার সরকার দিন মজুরিতে খেটে খাওয়া এই শ্রমিকদের দুর্ভোগ লাঘব করতে ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্প নিয়ে কাজ করছে। ১৩০ কোটি ভারতীয়দের শক্তিতে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসবেই আর সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখবে ভারতকে, এই আশাই করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

অন্যদিকে দেশে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। প্রতিদিনই যেন নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে কোভিড-১৯। এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে ভাইরাস, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৯৬৪ জন, আর এক দিনের মধ্যে ওই রোগের জেরে মৃত্যু হয়েছে ২৬৫ জনের। সব মিলিয়ে ভারতে মোট আক্রান্ত বেড়ে ১.৭৩ লক্ষ্যে পৌঁছল, এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৯৭১ জনের। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে ভারতে মোট করোনা আক্রান্ত ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৬৩ জন মানুষ। এই নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিন যখন ভারতে এক দিনে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজারেরও বেশি হয়েছে। এদিকে করোনার সংক্রমণে সবচেয়ে বিধ্বস্ত দেশেগুলোর তালিকায় ৯ নম্বরে উঠে এসেছে ভারত। তবে করোনার সংক্রমণের মধ্যেই আশার আলো এর সুস্থতার সংখ্যা। স্বাস্থ্য মন্ত্রক বলছে, ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন ওই রোগ থেকে। এদিকে দেশের ৩ রাজ্য, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং তেলেঙ্গানাতে এক দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। দেশের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য হলো মহারাষ্ট্র, সেখানে গত এক দিনে নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৯৮ জন মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে মারা গেছে ১১৬ জন। ওই রাজ্যে এখনো পর্যন্ত কোভিড আক্রান্ত ৬২ হাজারেরও বেশি।

 

"