অফিস খুলছে আজ

সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ৩১ মে ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনার কারণে ঘোষিত ছুটির মেয়াদ গতকাল শনিবার শেষ হয়ে গেছে। আজ রোববার খুলছে সব অফিস আদালত। সীমিত পর্যায়ে চালু হবে সব ধরনের গণপরিবহন। তবে কমছে না করোনা সংক্রমণের সংখ্যা। যদিও অন্যান্য দেশের তুলনায় সার্বিকভাবে করোনা পরিস্থিতি ভালো বলেই জানাচ্ছে সরকার। তবুও অফিস-যানবাহন চালু হওয়ার পর করোনা মোকাবিলাই আসল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে ভাইরাস সংক্রমণের হার অনেকটাই বেশি। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীর মতো জনবহুল শহরগুলোতে আক্রান্তের হার অনেক বেশি। বর্তমানে দেশের প্রায় সব জেলাতেই করোনাভাইরাসের হদিস মিলেছে। তবে ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে শহর এলাকাতেই।

স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে আজ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত অফিস, আদালত, গণপরিবহন, লঞ্চ, ট্রেন, বিমান ফ্লাইট সবকিছু সীমিত আকারে চালু হচ্ছে। খুলছে দোকানপাট, শপিংমল, ব্যবসা-বাণিজ্য। তবে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সীমিত আকারে সবকিছু খুলে দেওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়ে টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটির আবরণে থাকা লকডাউন পুরোপুরি তুলে দিয়েছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে, যা আজ থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।

লকডাউন তুলে দিয়ে সীমিত আকারে সবকিছু খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। মানুষের এই যাত্রাপথে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই-ই দেখা যায়নি। এদিকে সাধারণ ছুটির মেয়াদ আর না বাড়লেও প্রতিদিনই দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, যেকোনো সিদ্ধান্তের বেলায় জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করলে বলতে হবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে সংক্রমণ আরো বাড়বে। সংক্রমণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে তা এখনই বলা যাবে না। কার্যকর লকডাউন ও সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আলোকে সংক্রমণ পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এ পর্যন্ত কার্যকর লকডাউন হয়নি। এমনকি স্বাস্থ্যবিধি ও সামজিক দূরত্বও শতভাগ মেনে চলা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে হাজার হাজার মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন সংক্রমিত অঞ্চল থেকে গ্রামে আসা-যাওয়া করেছেন। ফলে সংক্রমণ পরিস্থিতি বাড়বে এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। দফায় দফায় সেই ছুটি ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে টানা ৬৬ দিন ছুটিতে ছিল সারা দেশ। এই সময়ের মধ্যে ২৬ এপ্রিল থেকে সরকার চলমান ছুটির পাশাপাশি সীমিত আকারে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অফিস ও দফতর খোলার নির্দেশ দেয়। এরপর গত এক মাস সাধারণ ছুটির আবরণে থাকা লকডাউন কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। ২৩ এপ্রিল এক আদেশে সরকার ছুটির মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ায়। এই সময়ে ঈদের ছুটিতে সাধারণ মানুষ যে যেভাবে পারে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। চলমান ছুটির মেয়াদ বাড়বে কি বাড়বে না এ নিয়ে বুধবার সারা দিনই নানা রকম কথা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু বুধবার বিকালেই সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেন ছুটির মেয়াদ বাড়ছে না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে শর্তসাপেক্ষে দেশের সার্বিক কার্যাবলি এবং জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে বলা হয়, ৩১ মে (আজ) থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত এ নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। সরকারের জারি করা নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞাকালে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় জনসাধারণের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। প্রতিটি জেলার প্রবেশ ও বহির্গমন পথে চেকপোস্টের ব্যবস্থা থাকবে। জেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় এ নিয়ন্ত্রণ সতর্কভাবে বাস্তবায়ন করবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধকল্পে চলাচলে নিষেধাজ্ঞাকালে জনগণকে অবশ্যই ঘরে অবস্থান করতে হবে। রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অতীব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (প্রয়োজনীয় ক্রয়-বিক্রয়, কর্মস্থলে যাতায়াত, ওষুধ ক্রয়, চিকিৎসাসেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে আসা যাবে না। তবে সর্বাবস্থায়ই বাইরে চলাচলের সময় মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনেকের প্রশ্ন, সাধারণ ছুটি শেষে রোববার থেকে অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারে জীবনযাপন। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বাস্থ্যবিধি কার্যকর করতে জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। ফলে পরিস্থিতি নাজুক হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।

কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, রোববার অফিস খুলছেÑ এ ঘোষণার সঙ্গে মানুষের ভাইরাসের ভয়ও কেটে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিনই যে এই ভাইরাসে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে তা কেউ কানেই নিতে চাচ্ছেন না। সরকার নানা শর্তে অফিস খুলছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে গণপরিবহন বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল করবে।

রাজধানীর বাসাবো বাজারের সামনে যে গলির আড্ডা দিচ্ছিলেন ৫/৬ জন তরুণ। তারা বলছিলেন, সবকিছু তো খুলে যাচ্ছে। ফলে এখন আড্ডা দিলে আর সমস্যা নেই। তবে এখন নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিতে হবে। নতুবা পরিস্থিতি খুবই নাজুক হতে পারে।

বিভিন্ন সড়ক ঘোরার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রিকশাচালক রফিক বলছিলেন, রাস্তাঘাটে এখন রিকশা, প্রাইভেট কার আর অটোরিকশার চলাচল বেড়েছে। ধারণা করছেন আজ থেকে ঢাকা সেই আগের রূপে ফিরবে।

পুলিশের ওয়ারী বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এত দিন কেউ অযথা রাস্তায় বের হলে জবাবদিহি করতে হয়েছে। বিনা কারণে ঘোরাঘুরি করলে গাড়ি ও চালককে জরিমানা করা হয়েছে। রোববার থেকে তা পুরোপুরি সম্ভব হবে না। কারণ সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকানপাট পুরোদমে খুলে গেলে তো আর মানুষকে ঘরবন্দি করে রাখা যাবে না।

তবে ডিএমপির এক উপকমিশনার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সাধারণ ছুটি তুলে নিলেও সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছেÑ এমনটা চিন্তা করার কারণ নেই। ছুটি তুলে নিয়ে যেসব শর্ত ও স্বাস্থ্যবিধির কথা বলা হয়েছে, পুলিশের পক্ষ থেকে তা বাস্তবায়ন করা হবে। মানুষ প্রয়োজনে বাইরে গেলেও এখন স্বাস্থবিধি আরো বেশি করে মানতে হবে। তা যাতে মানা হয় পুলিশ সেদিকে নজরদারি করবে।

 

"