খুলছে সব, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

* ৭ দিনে শনাক্ত ১০ হাজার হ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা * বাড়ছে অযথা ঘোরাঘুরিও * ধাপে ধাপে খোলা উচিত ছিল : ডা. মুশতাক

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে হুহু করে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এরই মধ্যে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে দুই মাসের সাধারণ ছুটি শেষে অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি গণপরিবহনও চালু হচ্ছে। এ খবরে দুই দিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাটে মানুষ ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে অযথা ঘোরাঘুরিও। এদিকে, গত সাতদিনেই ১০ হাজার মানুষের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। রোগীর এই চাপ সামলাতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এমনকি রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস স্বাস্থ্য অধিদফতরের। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর চত্বর ঘুরে দেখা গেছে, নারী-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ সেখানে ঘুরতে এসেছেন। আড্ডা-খোশগল্প করছেন। গড়াগড়ি-গলাগলি করে মোবাইল ফোনে সেলফি তুলছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিদিনের বুলেটিনে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে মাস্ক পরা, কমপক্ষে তিন ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ নানা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে। দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও গণমাধ্যমে একই বিষয়ে তাগাদা দিচ্ছেন। বলছেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে না বেরোতে। প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস পরার কথা বলছেন তারা।

কিন্তু ঢাকার রাস্তা ও ঘোরাঘুরির স্পটগুলো দেখলে যে কারো মনে হবে, এসব পরামর্শ তোয়াক্কা করছেন না বেশিরভাগ মানুষই। বিশেষ করে উঠতি বয়সিদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে খামখেয়ালি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বেশি। ফলে করোনা ছড়াচ্ছে মারাত্মক হারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন অনুসারে দেশে যে ৪০ হাজারেরও মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে সাড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া মৃত ৫৫৯ জনের মধ্যে ১৯৯ জনই ঢাকায় মারা গেছেন। ৮ মার্চ প্রথম শনাক্তের সংক্রমিতের সংখ্যা ১০ হাজার পৌঁছাতে সময় লেগেছে ২৮ দিন। দ্বিতীয় ১০ হাজার হয়েছে ১১ দিনে আর তৃতীয় ১০ হাজার রোগী মিলেছে সাত দিনেই। এরই মধ্যে বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে আসা ইঙ্গিত দিচ্ছে রোগীর চাপ আরো বাড়ার। এই অবস্থায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক শয্যা। প্রতিটি হাসপাতালেই থাকতে হবে কোভিড-১৯ চিকিৎসা সক্ষমতা। আর নিশ্চিত করতে হবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ। ডা. মোহাম্মদ জাকের উল্লাহ বলেন, প্রধানত নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে এবং সবাই মনে করবে এটা আমাদের দায়িত্ব। যেভাবে রোগী বাড়ছে দেখা যাবে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হবে। সেভাবে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। শঙ্কা রয়েছে শক্ত হাতে হাল না ধরলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে পরিস্থিতি। হাসপাতাল থেকে রোগী ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন তারা। ডা. রাইয়িক রিদওয়ান বলেন, আমার মতে, একটা প্রটোকল তৈরি করা দরকার ছেড়ে দেওয়ার সময় ২৪ ঘণ্টায় দুটি গ্যাপে নেগেটিভ আসলে ছাড়ছে। এতে রোগী আরো তিন থেকে চার দিন হাসপাতালে থাকছে। উপসর্গ ঠিক হলেই ছেড়ে দিতে হবে। এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়োপযোগী পরিকল্পনা সাজানোর দাবি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, জেলা স্বাস্থ্যতেও ব্যবস্থা করা হবে। এভাবে অনেক হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ব্যবস্থা করা হবে। এই মুহূর্তে দেশে করোনা শনাক্তের হার প্রায় ২০ শতাংশ।

দেশে একদিনে সর্বাধিক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের দিন গত বৃহস্পতিবারই ঘোষণা আসে, ৩১ মে থেকে অফিস খুলবে, বাস-লঞ্চ-ট্রেন-বিমান চলবে, খুলবে পুঁজিবাজার, ব্যাংকে লেনদেন হবে আগের মতোই। দোকানপাট তো ঈদের আগেই খুলেছিল। ভাইরাস সংক্রমণের দিক থেকে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে এভাবে সব খোলার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আপত্তি এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকেও। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অর্থনীতি সচলের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এসব খোলা হবে। ১৫ জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে ততদিনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অবস্থায় থাকবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। কেননা দেশে ‘লকডাউন’ও ঠিকভাবে করা যায়নি, যে কারণে ভাইরাস এখন ৬৪ জেলায়ই ছড়িয়ে পড়েছে।

বৈশ্বিক মহামারিআকার ধারণ করা কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত প্রথম রোগী বাংলাদেশে ধরা পড়েছিল গত ৮ মার্চ। রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়াতে লেগেছিল প্রায় এক মাস। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এক মাসের মধ্যে ৪ মে রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়, ততদিনে দোকানপাট, কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত এসেছিল। এরপর রোগীর সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এর মধ্যেই ঈদযাত্রায় ছাড় দেওয়া হলে তার প্রতিক্রিয়ায় এই মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গঠিত ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির’ সদস্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, তাহলে তো ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে!

বাংলাদেশের আগে বিভিন্ন দেশ লকডাউন শিথিল করে জনজীবনে স্বাভাবিক করার পথে হাঁটতে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা অনেকটাই উপেক্ষা করেই। তবে অন্যান্য দেশ তখনই লকডাউন শিথিল করেছে, যখন তাদের দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমে আসছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে যখন, তখন আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সবকিছু খোলার পর স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়া ঠেকাতে চাইছে সরকার। সেজন্য চলাফেরায় বিধিনিষেধ আগের মতোই থাকছে। আগের মতোই রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা সবাইকে ঘরে থাকতে হবে।

এই সময় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাবে না। হাট-বাজার এবং দোকানপাটগুলোতে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বেচাবিক্রি চলবে। সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত ও অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত বন্ধই থাকবে। ঈদের আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ঝড়-ঝঞ্ছা-মহামারিআসবে। সেগুলো মোকাবিলা করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে জীবন-জীবিকার মাঝে সাযুজ্য বিধানের যে প্রয়াস চলছে, তার থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে পারি না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড মাসের পর মাস বন্ধ রেখে কোনো দেশ টিকে থাকতে পারে না। উন্নত দেশগুলোতেও আস্তে আস্তে নানা কর্মকা- শুরু করা হয়েছে, মানুষ কাজে ফিরে গেছে। আমাদেরও ধীরে ধীরে সেই কাজটি করতে হবে। কী বলছেন বিশেষজ্ঞরাÑ এক সঙ্গে প্রায় সব খুলে দেওয়াটাকে ছোঁয়াচে এই রোগ বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া বলে মনে করছেন ডা. মুশতাক হোসেন। কোভিড-১৯ মহামারি ঠেকানোর লড়াইয়ে থাকা আইইডিসিআরের অবসরপ্রাপ্ত এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন,রোগের সংক্রমণ বাড়ছে; মৃত্যুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। স্কুল ছাড়া সবই তো খোলা হলো। আর বাকি কী রইল? ঢালাওভাবে ছুটি প্রত্যাহার করে দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। এটা তো আর সীমিত থাকবে না। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে; এভাবে ঢালাওভাবে চাকরি বাঁচার কথা বলে কাজে যোগ দিলে সেই ঝুঁকিই তো থেকে গেল।

 

"