১১ লাখ রোহিঙ্গার ভারে ‘ভারাক্রান্ত’ বাংলাদেশ

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা আর বইতে পারছে না বাংলাদেশ। অন্য যেকোনো দেশ চাইলেই নিজ দেশে নিয়ে রাখতে পারে রোহিঙ্গাদের। সম্প্রতি ঢাকা থেকে এক কূটনীতিক নোটে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে জেনেভায় থাকা মিশনগুলোকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, বাংলাদেশকে উপদেশ না দিয়ে মিয়ানমারের পরিস্থিতিতে নজর দিলে এতদিনে সংকট সমাধানে রূপ নিত। এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বহুমুখী ও ভারসাম্য কূটনীতির বিকল্প নেই। ৭০ দশকের শেষ থেকে নির্যাতন থেকে বাঁচতে, বাংলাদেশে আসতে শুরু করে মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। শুরুতে সংখ্যায় কম হলেও, গত১০ বছওে বেড়েছে বহুগুণ। সর্বশেষ ২০১৭ তে একসঙ্গে আসেন ৮ লাখেরও বেশি। সবমিলে এ মুহূর্তে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে রয়েছেন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ের চূড়ায় এসব রোহিঙ্গার অবস্থান। তাদের শিবিরগুলো অরক্ষিত থাকায় রোহিঙ্গারা সর্বত্র বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। এসব রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থাসহ আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নিয়ে নোয়াখালী ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তরের দাবি তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা দফায় দফায় ৪০ বছর ধরে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। আরকান রাজ্যে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, যার ফলে তাদের ওপর হামলা, নির্যাতন, বিনা পারিশ্রমিকে মজুরি, উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ লুট, চলাচলে বাধা, অনুমতিতে যাতায়াতসহ বিভিন্ন বাধায় মুসলমান রোহিঙ্গারা সহায়-সম্পত্তি ও বসতবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে আরকান রাজ্যের রোহিঙ্গারা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। সর্বশেষ গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর নিপীড়ন শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসে। ওই সময় ৭ লাখের বেশি নতুন রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। এর আগে আরো৪ লাখ মতো পুরাতন রোহিঙ্গা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছিল। সবমিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে।

এসব রোহিঙ্গাদের দেখভাল করতে, বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে জাতিসংঘ। তবে বেশকিছু বিষয়ে উদ্বেগ আছে সংস্থাটির। যার মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পগুলোতে মোবাইলে নেটওয়ার্ক ফোর-জি না হওয়া, করোনা সতর্কতায় বিদেশি ডাক্তারের প্রবেশে জটিলতা, সমুদ্র সীমানায় ভাসমান রোহিঙ্গাদের স্থান না হওয়ার মতো বিষয়গুলো। এ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে জেনেভার মিশনগুলোকে চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ। বলেছে, অন্য কোনো দেশ চাইলেই, নিজ দেশে নিয়ে রাখতে পারে রোহিঙ্গাদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট বহুমুখী জটিল এক সংকট। তাই এ সংকট সমাধানে, বহুমুখী ও ভারসাম্যের কূটনীতির বিকল্প নেই। জেনেভায় পাঠানো কূটনীতিক নোটে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাচার রোধ ও গুজব ঠেকাতেই ক্যাম্পে মোবাইল তরঙ্গের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে আসা নতুন নয়। ১৯৭৮ সালে সর্বপ্রথম মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে পালিয়ে আসে। এ সময় সে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে সাড়ে ৩ লাখ মতো রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে কক্সবাজার, রামু, নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়। তবে আন্তজার্তিকভাবে কোনো সাহায্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল না। তাই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সরকার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ২ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত দেয়। এ সময় দেড় লাখ মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে যায়। এরা দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এরপর ১৯৯২ সালে আবারও নির্যাতনের মুখে আড়াই লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরা বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় ১৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়। এ ক্যাম্পগুলোর বেশির ভাগ বন বিভাগের জমিতে স্থাপন করা হয়েছিল। পরে ২০১২ সালের জুনে মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গা মংডু থেকে আকিয়াব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। এতে প্রাণ বাঁচাতে পালায় রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। এরপর ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন পুলিশ হতাহত হয়। মিয়ানমার এ হামলায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা জড়িত বলে দাবি করেন। পরদিন হঠাৎ সেনারা সন্ত্রাসী দমনে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ধরপাকড়, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। এতে রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসেন। এ সময় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

সর্বশেষ গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যের ২৪টি পুলিশ ফাঁড়িতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। সে দেশে সেনারা সহিংসতার মুখে অপরাধী দমনের নামে শুরু হয় অভিযান। এতে প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ সময় সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফে পাহাড় ও সমতলে। কক্সবাজারের দুই উপজেলায় বর্তমানে ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস করে রেহিঙ্গা শিবির তৈরি করা হয়। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে দেশি-বিদেশি সংস্থার চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার ২০১৭ সালে ২৩ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। পরে এক বৈঠকে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসন শুরুর দিন ঠিক করা হয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যথাসময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

প্রথম দফায় রোহিঙ্গাদের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত ট্রানজিট পয়েন্ট দিয়ে পাঠানোর কথা ছিল। এ সময় মিয়ানমারে নিপীড়ন ও বৈষম্যের কারণে রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরতে রাজি হয়নি। রোহিঙ্গাদের মাঝে ভয় ছিল তারা এভাবে ফেরত গেলে আবারও নির্যাতনের শিকার হবে। তবে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে ইচ্ছুক না, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও স্বদেশের জমি জামা ফেরতের দাবি করেছেন। এর ফলে এবারের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যায়। এর আগে ১৯৯২ সাল থেকে কয়েক বছরে পালিয়ে আসা আড়াই লাখ মতো রোহিঙ্গা টেকনাফের নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে ২০০১ সাল পর্যন্ত এসব রোহিঙ্গার মধ্যে ২ লাখেরও বেশি শরণার্থী মিয়ানমারে ফিরে যায়। সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৫ মে এক পরিবারের দুজনসহ ৯২ জন দেশে ফেরার পর মিয়ানমার হঠাৎ করে প্রত্যাবাসন বন্ধ করে দেয়। ওই সময় উখিয়া ও টেকনাফের দুই শিবিরে প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা আটকা পড়ে। তারা প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় ছিল।

কক্সবাজার সির্ভিল সার্জনের মতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে দুই বছরের এই সময়ে প্রায় ৩৭ হাজার নারী অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তার মধ্যে ৯ হাজার ৩৪৯ জন নারী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসব করে। বাকিদের হোম ডেলিভারি হয়েছেন। তবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর এই দুই বছরে শিবিরগুলোতে অনুমানিক ৫০ হাজারের মতো শিশু জন্ম হয়েছে। এর কোনো সঠিক তথ্য সরকারি-বেসরকারি বা এনজিও সংস্থার কাছে পাওয়া সম্ভব হয়নি। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) মুহিব উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে থাকবে এটা কিন্তু আমরা চাই না। বাংলাদেশ আমাদের বাড়ি নয়। চিরদিন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে থাকতে চাই না। আমরা নিজ দেশে ফিরতে চাই।

প্রায় দুই বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদল, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী-এমপিরা রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন। এতে খুব একটা সুফল ভয়ে আসেনি। টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুর আলম বলেন, মিয়ানমারের মিথ্যাচারের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এখন বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে, এতে দেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। তবে রোহিঙ্গার তৎপরতায় নানা সংকট তৈরি করলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করে যাচ্ছেন। উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল খায়ের জানান, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো পাহাড়ের তীরে হওয়ায়, বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে অপরাধ প্রতিদিনই বাড়ছে। তবু রোহিঙ্গা শিবিরে বিশৃঙ্খলা ঠোকাতে রাতদিন দায়িত্বপালন করছে পুলিশ।

 

"