ঈদ শেষে ঢাকামুখী ঢল

ফেরিতে উপচেপড়া ভিড়

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক ও মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

ঈদের ছুটি শেষ, লকডাউনও আর বাড়ছে না; দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানীমুখী হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে। কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ছিল ঢাকামুখী যাত্রীদের ঢল। ফেরিতে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি উপক্ষো করে গাদাগাদি করে মানুষ ফেরিতে করে পদ্মা নদী পাড়ি দিচ্ছে। এ রুটে ৪টি রোরো, ৪টি কে-টাইপ ও ২টি মিডিয়ামসহ ১০টি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যান পারপার করা হচ্ছে। তবে পদ্মায় ¯্রােত থাকায় ৬টি টানা ফেরি চলতে পারছিল না। এদিকে, বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম ফজলে আকবর বলেন, প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত বাড়লেও জনসচেতনতা বাড়েনি। এ প্রবণতা বিপদ ডেকে আনছে। ফেরিঘাটে মানুষের ঢল, মুখে কারো মাস্ক নেই। এ জনসমাগম ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এভাবে ঢাকামুখী মানুষের ঢল ঠেকাতে না পারলে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কুটসটাউন ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভানিয়ার ক্রিমিন্যাল জাস্টিস বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজুল ইসলাম খোন্দকার বলছেন, সবাই ছুটে আসছে ঢাকায়। নিজ এলাকায় কাজ নেই, চলো ঢাকায় যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করতে হবে, চলো ঢাকায় যাই। বাজার করতে হবে, চলো ঢাকায় যাই। রিকশা চালাতে হবে বা বুয়ার কাজ করতে হবে, তাও চলো ঢাকায় যাই। আর একবার ঢাকায় এলে এখান থেকে আর কেউ ফিরে যেতে চায় না। আমি এ রকম অনেককে জানি, যারা ঢাকায় সরকারি চাকরি করেন এবং তাদের যখন ঢাকার বাইরে বদলি করা হয় তখন তারা তদবির শুরু করেন যেন সেই বদলি রদ করা যায়। আর বাইরে থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসার জন্য তদবির তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

একটা সময় ছিল, খুব বেশি দিন আগে নয়, মানুষ গ্রাম বা মফস্বল থেকে ঢাকায় আসত এবং স্থায়ীভাবে বাস শুরু করত, কিন্তু নাড়ির টান কখনোই ভুলত না। অন্ততপক্ষে বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর আগে গ্রামে চলে যেত অনেকেই, চাইত মৃত্যুটা যেন সেই ছায়া-সুনিবিড় শান্তির গ্রামেই হয়। আর এখন হয়েছে উল্টো। গ্রামের বা মফস্বলের মানুষ মৃত্যুর ঠিক আগে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসে। অনেকের মৃত্যু হয় আসার পথে অ্যাম্বুলেন্সে আবার অনেকের মৃত্যু হয় ঢাকার হাসপাতালে। মৃত্যুর পর আবার যাত্রা শুরু হয় গ্রামের দিকে। বিষয়টি এমন হয়েছে যে মরতে হলেও যেন ঢাকায় আসতে হবে।

বাংলাদেশের পরিকল্পনাবিদেরাসহ সবাই বলছেন যে ঢাকা বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে; এখানে ঠিকমতো চলা যায় না, এমনকি নিঃশ্বাসও নেওয়া যায় না। আমরা সবাই জানি যে ঢাকা শহরে যানজটের কারণে চার কিলোমিটার রাস্তা যেতে ২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। ধুলাবালুতে বাতাস ভর্তি। সারা বছর ধরে চলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি; হয় রাস্তার সংস্কার, নয় বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চালন লাইন মেরামতি, বিস্তার ইত্যাদি। ছিনতাই-রাহাজানি থেকে শুরু করে খুনখারাবি, রাজনৈতিক হানাহানি থেকে শুরু করে অবৈধভাবে সরকারি-বেসরকারি জমি দখল, এক কথায় সব ধরনের অপরাধ ঢাকায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেককেই বলতে শুনি বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, মৃত্যু হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। ঢাকা নিয়ে সবার অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু কেউ ঢাকা ছেড়ে যেতে রাজি নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিকল্পনাবিদরা এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন তাদের কেউই ঢাকা ছেড়ে যেতে রাজি বলে মনে হয় না। যদি হতেন, তাহলে সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র ঢাকায় হতো না।

তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্য এলাকাগুলো গড়ে তোলা গেলে নিঃসন্দেহে অপরাধের মাত্রা অনেক কমে যাবে। অপরাধের কোনো তাত্ত্বিক পর্যালোচনায় না গিয়েও বলা যায় যে সমাজের এলিট শ্রেণির জমি দখলের মতো অপরাধমূলক কার্যকলাপ অনেক কমবে, যখন মানুষের আর ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা থাকবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, নগরের যেসব স্থানে জনসংখ্যা বেশি, সেখানে অপরাধের মাত্রাও বেশি।

মানুষের যদি কাজ থাকে আর সেই কাজ থেকে যদি আয় হয় তাহলে মানুষ খুব কমই অপরাধে জড়ায়। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে উন্নত করে কাজের বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে অনেক মানুষই গ্রাম বা মফস্বলে বসে ভালো উপার্জন করতে পারবে। তখন স্বাভাবিকভাবে অপরাধের মাত্রাও কমবে। ঢাকা থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়া গেলে ঢাকায় তৈরি করা যাবে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ এবং পার্কের মতো সামাজিক বিনোদনের জায়গা। অপরাধের একটি তত্ত্ব বলে, শিশু-কিশোরেরা অপরাধে জড়ায় যখন ইতিবাচকভাবে সময় কাটানোর সুযোগ তাদের থাকে না। তাই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে প্রচুর পার্ক ও খোলা জায়গা রাখা হয়। এতে বিশেষ করে কিশোরেরা তাদের প্রাণচাঞ্চল্য ও সময় ইতিবাচকভাবে প্রয়োগ করতে পারে। সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে জনসংখ্যার চাপ কমানো যেতে পারে।

বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়া ঘাটের এজিএস মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে কাঁঠালবাড়ী থেকে হাজার হাজার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে শিমুলিয়ায় আসেন। তবে চলাচলে স্বাস্থ্যবিধি মানেননি তারা। বুধবার পদ্মায় যে ২ নম্বর সংকেত ছিল সেটা বৃহস্পতিবার সকালে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। পদ্মার বুধবারের মতো ¯রাত না থাকলেও কিছুটা উত্তাল; সঙ্গে বাতাস ছিল। তাই সব ফেরি চলতে পারছিল না। যে ১০টি ফেরি চলছিল সেগুলো খুব সাবধানে চলছিল। ¯রাতের কারণে ফেরিগুলোর যাওয়া-আসায় সময় লাগছে বেশি। আমরা চেষ্টা করছি নির্বিঘেœ পারাপার করাতে। এছাড়া ‘কর্ণফুলী’ নামে একটি ছোট ফেরি স্ট্যান্ডবাই রাখা আছে। জরুরি প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করা হবে।

এদিকে শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, যাত্রীরা ঘাটে নেমে গণপরিবহন না পেয়ে পড়ছেন বিপাকে। তাদের অনেককেই ছোট গাড়ি, অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল এমনকি পিককাপে বা ট্রাকে করেও গন্তব্যে রওনা দিতে দেখা গেছে। এতে যাত্রীদের কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ঘাটে কোনো যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই রওনা হয়েছেন গন্তব্যে।

মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবির বলেন, আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তায় কাজ করছি কিন্তু যাত্রীরা শুনছেন না। কারো ধৈর্য নেই। ঘাটে এসে হুড়াহুড়ি করে তারা ঝুঁকি বিভিন্ন যানে চড়ে গন্তব্যে রওনা দিচ্ছেন। তবে নৌপথে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

"