এ সময়েও বাড়ি ছাড়তে বলছেন বাড়িওয়ালা

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

টাঙ্গাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক ভাড়া থাকেন রাজধানীর বাসাবোয়। এলাকাটি অবরুদ্ধ থাকলেও তিনি সেখান থেকেই নিয়মিত কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে তিনি পেয়েছেন বাড়ি ছাড়ার নোটিস। এই চিকিৎসক জানান, যেহেতু তিনি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, তাই তার মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় বাড়ির মালিক তাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছেন।

আতঙ্কজনক এক পরিস্থিতিতে যখন চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রচ- মানসিক চাপ সামলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তখন তাদের সঙ্গে এলাকাবাসী, বাড়ির মালিকদের বিরূপ আচরণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনও (বিএমএ)। তবে চিকিৎসক-নার্সের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করলে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। করোনা মহামারির সম্মুখ যোদ্ধা চিকিৎসক-নার্সদের সঙ্গে ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, ভাড়াটিয়া ও বিশেষ করে বাড়িমালিক বিরূপ আচরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করে দিয়েছে ডিএমপি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান। বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সরা করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি করোনার বিস্তার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিজ নিজ বাড়ি, ফ্ল্যাটে রেখে চিকিৎসা ব্যবস্থার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা এতে বাধা দিচ্ছেন। এমনকি করোনা রোগীদের চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে বাড়ির মালিকদের বিরূপ আচরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে সম্মুখ যোদ্ধার ভূমিকায় থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে বিরূপ আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক ও সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। এজন্য ফ্ল্যাটের মালিক ও বাসিন্দাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছে পুলিশ।

বাসাবোতে থাকা ওই চিকিৎসক ক্ষোভ নিয়ে বলেন, এই সময়ে বাড়ি ছেড়ে দিলে আমি থাকব কোথায়? আর ডাক্তার জেনে তো অন্য কেউ ভাড়াও দেবে না। এখন তো মনে হচ্ছে, এই পেশায় আসাটাই ঠিক হয়নি। ভবনের এমন কেউ নেই, যাকে আমি চিকিৎসাসেবা বা এ সংক্রান্ত পরামর্শ দেইনি। কিন্তু এ সময়টায় সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে আমাদের। করোনাভাইরাসের জীবাণু যেন ছড়াতে না পারে সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই চিকিৎসাসেবা দেন বলে জানান তিনি। এই বাড়িতে থাকা অন্যদের সঙ্গে আমি কথা পর্যন্ত বলি না। বাড়ির সামনে থেকেই গাড়িতে উঠে চলে যাই। আর আমাদের কাছে করোনাভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে কোনো রোগী এলে তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেই। দুই নাতিকে দেখাশোনার জন্য তার মা আসতেন প্রতিদিন, তাকেও আসতে বারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ গুলজার হোসেন উজ্জ্বল গত ১৪ এপ্রিল ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে এক চিকিৎসক দম্পত্তির বিড়ম্বনার কথা জানান। তিনি লেখেন, আক্রান্ত ব্যক্তির স্যাম্পল নিতে গিয়ে উপজেলা হাসপাতালে কর্মরত এক ডাক্তার নিজেই আক্রান্ত হন। করোনা পজিটিভ হওয়ার পর তারা স্বামী-স্ত্রী যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেখানে কোয়ারেন্টাইন্ড হন। এলাকাবাসী জানতে পেরে লাঠিশোটা নিয়ে তেড়ে আসে। তারপর অভুক্ত অবস্থায় তাদের বাড়ি ছাড়া করে।

চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনও।

তিনি বলেন, সারা দিন চিকিৎসাসেবা দিয়ে যখন একজন স্বাস্থ্যকর্মী বাসায় যাচ্ছেন, তখন বাড়িওয়ালা হুমকি দিচ্ছেন, বাসায় থাকতে পারবেন না। একজন স্বাস্থ্যকর্মী সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে কাজ করেন এবং বাড়ি ফেরেন। সেখানে তাদের সঙ্গে এমন আচরণ খুবই দুঃখজনক।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের বলেন, যারা এ কাজগুলো (বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়া, বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়া ইত্যাদি) করছে, সে কাজগুলো না করতে বাধ্য করার উপায় হলো আইন। বক্তৃতা দিয়ে, মানবিকতার কথা বলে এসব লোকদের নিবৃত্ত করা যাবে না। ফলে প্রয়োজনীয় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনটি হলো সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮। এই আইনে সে সুযোগটা আছে। এর ৩ ধারায় এ আইনটিকেই সব আইনের ওপরে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি আইনটির ৬ ধারায় সুনির্দিষ্ট উপায়ে উপদেষ্টা কমিটি গঠন ও তাদের সুপারিশে যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় বলে উল্লেখ আছে।

 

"