‘গরিবের চিকিৎসক’ মঈনের জন্য কাঁদছে সিলেট

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

সিলেট প্রতিনিধি

সিলেটে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে করোনার কাছে হার মানলেন ‘গরিবের চিকিৎসক’ খ্যাত ডা. মো. মঈন উদ্দিন। ৯ দিন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে গতকাল বুধবার ভোর সাড়ে ৪টায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক।

মানবদরদি চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন সিলেটে করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। তিনি সিলেটে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ টিমের সদস্য ছিলেন। তার মৃত্যুর খবর সিলেটে ছড়িয়ে পড়ার পর তার সহকর্মী, ছাত্রছাত্রীসহ সিলেটবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পরোপকারী এই চিকিৎসকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে অনেকে দোয়া চেয়েছেন। তার স্মৃতিচারণ করে অনেকেই লেখেন, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের গরিবের চিকিৎসক। মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এ গুণী চিকিৎসকের মৃত্যুতে যেন কাঁদছে সিলেট।

২০১৪ সালে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পর এখানেই তিনি গ্রামের খেটে খাওয়া গরিব-দুঃখী মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তার সেবা নিয়ে খুশি ছিলেন রোগী ও স্বজনরাও। ডা. মঈন উদ্দিনের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়া একজন নিম্নবিত্ত পরিবারের রোগী নগরের আখালিয়া এলাকার আরব আলী তার মৃত্যুর খবর শুনে এ প্রতিবেদককে ফোন করে বলেন, তিনি আমার চিকিৎসক ছিলেন। তাকে আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রাইভেটে দেখিয়ে আসছি। ১০০ থেকে ২০০ যা-ই রোগী দেখার ফিস দিয়েছি হাসিমুখে নিয়েছেন। কোনোদিন মুখ কালো করেননি। এই সমাজে তার মতো একজন ভালো চিকিৎসক পাওয়া বিরল।

জানা গেছে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হন ডা. মঈন উদ্দিন। তিনি সিলেটের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী। গত ৫ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। গত ৩০ মার্চ থেকে তিনি তার বাসায় কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ৭ এপ্রিল সিলেট নগরের শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে করোনা আইসোলেশনে সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।

৮ এপ্রিল পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালেই তার চিকিৎসা চলছিল। গত সোমবার সকাল থেকে তাকে আইসিইউয়ে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেওয়া হয়। আইসিইউয়ে থাকা অবস্থায় বুধবার ভোর সাড়ে ৪টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ডা. মঈন উদ্দিন ছিলেন সিলেটের একজন মেধাবী চিকিৎসক। তিনি মেডিসিনের পাশাপাশি কার্ডিওলজিরও চিকিৎসক ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ১৯৯৮ সালে তিনি এফসিপিএসের পাশাপাশি কার্ডিওলজিতে এমডি করেন। এ কারণে রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। তার সহজ, সরল ও সাবলীল ব্যবহার রোগীদের মুগ্ধ করত।

ডা. মঈন উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের নাদামপুর গ্রামে। নাদাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন। তিনি ধারণ নতুনবাজার উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং সিলেটের এমসি কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে কৃতীত্বের সঙ্গে এমবিবিএস পাসের পর তিনি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন।

স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ কলেজে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুকালে তিনি দুটি অবুঝ ছেলে ও স্ত্রী পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. ইফ্ফাত জাহান এবং তিন বোন রেখে গেছেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তার বড় দুই ভাই মারা গেছেন। ভাইদের মধ্যে তিনি একমাত্র বেঁচে ছিলেন। তার তিন বোনের সবাই শিক্ষক। ডা. মঈনের শ্বশুর ডা. নুর আহমদ ও শাশুড়িও চিকিৎসক। তার বাবা মরহুম মুন্সি সিকদার আলী একজন আলেম ছিলেন।

উত্তর খুরমা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ডা. মঈন উদ্দিনের আত্মীয় মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, তিনি একজন মেধাবী ও সৎ চিকিৎসক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার মৃত্যুতে কেবল তার জন্মস্থান ছাতক নয়, পুরো সিলেট কাঁদছে। তিনি বলেন, ডা. মঈন গরিব রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন না। বিশেষ করে গ্রাম থেকে যাওয়া গরিব রোগীদের ভালোবাসতেন। তিনি আমার পারিবারিক চিকিৎসকও ছিলেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ও ওসমানী হাসপাতালের সাবেক উপপরিচালক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, ডা. মঈন উদ্দিন একজন দায়িত্ব সচেতন চিকিৎসক ছিলেন। তিনি কখনো সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করতেন না। তিনি গরিব রোগীদের আপনজন মনে করে চিকিৎসা করতেন। আমি তার মাগফিরাত কামনা করি।

 

"