কৃষকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী* ত্রাণ চুরি করলে তাৎক্ষণিক বিচার * দূরত্ব নিশ্চিতে খোলা জায়গায় বাজার বসান *কৃষকরা যেন কোনো জায়গা ফাঁকা না রাখেন

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের দেওয়া ত্রাণ কেউ চুরি করলে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা করা হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কয়েকটি খবর এসেছে। আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি; কিন্তু সেই সহায়তা নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করা হচ্ছে। এসব করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) বসিয়ে তাদের বিচার করা হবে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে জেলা পর্যায়ে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে গতকাল রোববার খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে এ ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ১০টায় তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে এই ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন তিনি। এ সময় করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে হাট-বাজারগুলোকে মাঠ বা খোলা জায়গায় নেওয়ার পরামর্শ দেন সরকারপ্রধান। এছাড়া করোনাভাইরাসে কৃষি খাতের ক্ষতি মোকাবিলায় কৃষকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেন তিনি। এ তহবিল থেকে সহজ শর্তে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন কৃষক।

কৃষকের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কোনো জায়গা ফাঁকা রাখবেন না। একটু জায়গাও ফেলে রাখবেন না। যার যতটুকু জায়গা আছে সবটুকুতে চাষাবাদ করুন।

সামাজিক দূরত্বে নিশ্চিতে হাট-বাজারগুলোকে মাঠ, বড় রাস্তা বা খোলা জায়গায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজারেও সেই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এটা করলে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত হবে এবং সংক্রমণ ছড়াবে কম। মাঠ বা খোলা জায়গায় দূরত্ব বজায় রেখে যার যার পণ্য নিয়ে বসবেন। সবাই সেখান থেকে কিনে নিয়ে যাবে। কোনো ভিড় যেন না হয়। এ বিষয়ে আপনারা বিশেষভাবে দৃষ্টি দেবেন।

করোনা সংক্রমণরোধে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের রক্ষাটা নিজেকেই উদ্যোগ নিয়ে করতে হবে। সে ব্যাপারে সবাইকে আরে উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষে সংস্পর্শ যত কমানো যায় সেটাই ভালো। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষ সুস্থ হয় এটা ঠিক। এখানে মৃতের হার পারসেনটিজ অনুযায়ী কম থাকলেও এটা মানুষকে ভোগায়, মানুষকে কষ্ট দেয়। বিশেষ করে বয়স্ক, হার্টের অসুখ আছে, কিডনির অসুখ আছে, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ আছে তাদের জন্য খুব মারাত্মক ভাইরাসটি।

দেশের মানুষকে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচাতে সবকিছু বন্ধ করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই একটা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব স্থবির। স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্পূর্ণ স্থবির, সারা বিশ্বের মানুষ কিন্তু ঘরে বন্দি। আমরাও এই ভাইরাস থেকে দেশবাসীকে বাঁচানোর জন্য সব কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছি। সবাইকে অনুরোধ করছি, আপনারা যার যার নিজের ঘরে থাকুন। আপনার ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘরে থাকুন। কারো সঙ্গে মেশার দরকার নেই। প্রত্যেকে যার যার এলাকা সুরক্ষিত করেন। হঠাৎ করে বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেবেন না। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা জেলা থেকে এখন অন্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। অন্তত কয়েকটা দিন আপনারা নিজের এলাকাকে সুরক্ষিত করেন।

করোনা পরিস্থিতিতে সবার কষ্টকর জীবন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জানি এর জন্য কষ্ট হচ্ছে সবার। কষ্ট লাঘবে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ২৩টি গাইড লাইন প্রস্তুত করেছে। এগুলো স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যমে আমরা অনবরত প্রচার করে যাচ্ছি। এসব বিষয়ে নজর দেবেন, মেনে চলবেন।

সবাইকে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, প্রত্যেকে মুখে মাস্ক ব্যবহার করবেন। এটা ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। মাস্ক ব্যবহার করলে নিজেকে অনেকটা সুরক্ষিত রাখতে পারবেন। হাত না ধুয়ে চোখে মুখে হাত লাগাবেন না। হাঁচি-কাশি এলে কাপড়, রুমাল, টিস্যু ব্যবহার করেন অথবা আপনি কনুই দিয়ে হাঁচি-কাশি দেন।

নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে আবারো জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নববর্ষে বাইরে কোনো প্রোগ্রাম করা যাবে না। ঘরে বসে রেডিও-টেলিভিশনে অনুষ্ঠান হবে বা স্যোশাল মিডিয়ায় উদযাপন করা যাবে। কিন্তু কোনো জনসমাগম করা যাবে না। জনসমাগম করলে এই ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে যাবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে চাষিদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে; যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিরা ৫ শতাংশ সুদে এ ঋণ নিতে পারবেন। এছাড়া সারের জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের জন্য ১০০ কোটি টাকা, বীজের জন্য ১৫০ কোটি টাকা এবং কৃষকের জন্য আরো ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, এ প্রণোদনা গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য। যারা পোলট্র্রি, কৃষিফার্ম, ফলমূল, মসলাজাতীয় খাদ্য পণ্য উৎপাদন করবেন তারা এখান থেকে ঋণ নিতে পারবেন। আমাদের আরো একটি উদ্যোগ চলমান আছে। পেঁয়াজ, রসুন, আদার মতো মসলা যারা উৎপাদন করছেন, তাদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয়। এই সুবিধা চালু থাকবে। এর পাশাপাশি আমাদের নতুন স্কিম হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা প্যাকেজ চালু থাকবে।

তিনি বলেন, আমরা এর আগে সব ধরনের শিল্প খাতের জন্য প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। কিন্তু আমরা কৃষিপ্রধান দেশ। ফলে আমাদের কৃষকদের জন্য সহায়তা প্রয়োজন। আমরা সেই সহায়তা অব্যাহত রাখব।

কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করতে এ বছর সরকারিভাবে ধান-চাল বেশি কেনার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের কৃষিপ্রধান দেশ। কয়েক দিনের মধ্যে বোরো ধান উঠবে। কৃষক যেন ধানের ন্যায্য দাম পায়, সে জন্য এ বছর খাদ্য মন্ত্রণালয় গত বছরের চেয়ে আরো বেশি ধান-চাল কিনবে। এ বছর মন্ত্রণালয় থেকে ২ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল কেনা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধানকাটা ও মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়ে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। আমরা দেখেছি, অন্য বছর ধানকাটা ও মাড়াইয়ের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যায় না। তবে এবার যেহেতু করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তারা এখন ধানটাকা ও মাড়াইয়ে কাজ করতে পারবেন। তারা কাজ করতে চাইলে সে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

গণভবনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। ভিডিও কনফারেন্স সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।

 

"