বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার

ফাঁসির সেলে খুনি মাজেদ

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত খুনি আবদুল মাজেদকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। তবে শুনানির সময় খুনি মাজেদের পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এর আগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার রাতে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পলাতক ছয় খুনির একজনকে ধরা হলো। এখন বঙ্গবন্ধুর পাঁচ দন্ডপ্রাপ্ত খুনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছেন। এর মধ্যে রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায় ও নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থায় করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ বেরিয়েছে। এছাড়া শরিফুল হক ডালিম, কর্নেল রশীদ, মুসলেহ উদ্দিন রিসালদার পলাতক রয়েছেন।

এদিকে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হেমায়েত উদ্দিন খান বলেন, মাজেদ ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামি। এখন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রাণভিক্ষা করার সুযোগ রয়েছে তার। এছাড়া আর কোনো সুযোগ পাবেন না তিনি।

পুলিশ সদর দফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারের আগে মাজেদ কোথায় ছিলেন তা পুলিশের জানা ছিল না। তবে করোনা পরিস্থিতিতে তাকে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছিল। এ খবর পেয়ে মিরপুর সাড়ে ১১ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারি, আবদুল মাজেদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এরপর নজরদারির মাধ্যমে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে আটক করা হয়। আসামির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর থেকে ক্যাপ্টেন মাজেদ পলাতক ছিলেন। পলাতক ছয় খুনির মধ্যে ক্যাপ্টেন মাজেদ ছিলেন অন্যতম। তার গ্রামের বাড়ি ভোলায়।

এদিকে আবদুল মাজেদ যখন আসামির কাঠগড়ায় অবস্থান করছিলেন, তখন তার সঙ্গে কথা বলেন হেমায়েত উদ্দিন খান। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এত দিন আপনি কোথায় ছিলেন? জবাবে খুনি মাজেদ বলেন, ২২ থেকে ২৩ বছর তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন। সেখান থেকে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। খুনি মাজেদ আরো জানান, তার এক ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপপরিদর্শক (এসআই) আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে তিনি দায়িত্বে ছিলেন। রাত ৩টা ৪৫ মিনিটে সন্দেহজনকভাবে রিকশায় করে মিরপুরে যাওয়ার সময় ওই ব্যক্তিকে থামান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অসংলগ্ন কথা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি নিজের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন এবং বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। জিজ্ঞাসাবাদে মাজেদ আরো স্বীকার করেন, গ্রেফতার এড়ানোর জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে ছিলেন। তার স্ত্রী মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট আবাসিক এলাকায় বাস করছেন। মাজেদের চার কন্যা ও এক ছেলে রয়েছে।

ফিরে দেখা : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু এই হত্যাকান্ডের বিচারে পদে পদে বাধা আসে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।

১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এরপর ১২ আসামির মধ্যে প্রথমে চারজন ও পরে এক আসামি আপিল করেন। কিন্তু এরপর ছয় বছর আপিল শুনানি না হওয়ায় আটকে যায় বিচার প্রক্রিয়া।

দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি আবার গতি পায়। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির লিভ টু আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। আপিলের অনুমতির প্রায় দুই বছর পর ২০০৯ সালের অক্টোবরে শুনানি শুরু হয়। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করেন। ফলে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাইকোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল থাকে। এর মধ্য দিয়ে ১৩ বছর ধরে চলা এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলে দায়মুক্ত হয় বাংলাদেশ।

 

"