তাবলিগে গিয়ে সংক্রমণ

দিল্লিতে ৭ জনের মৃত্যু নিজামুদ্দিন মসজিদ বন্ধ

ভারতে সংক্রমণ বাড়ছে পরিস্থিতি ভয়ংকর হওয়া আশঙ্কা

প্রকাশ | ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

দিল্লির নিজামুদ্দিনের একটি মসজিদে তাবলিগ জামাতে যোগ দেওয়ার পর ফিরে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাতজন মারা গেছেন এবং আক্রান্তের লক্ষণ থাকায় আরো ২০০ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তাবলিগ জামাতের শাদপন্থিদের হেড-কোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত সেই মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সাড়ে আটশ’ মানুষকে সেখান থেকে বাসে করে বিভিন্ন স্থানে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। দিল্লির পশ্চিম নিজামুদ্দিনে তবলিগ-ই-জামাতের মসজিদ থেকে কমপক্ষে ৮৫০ জনকে অন্য একটি জায়গায় কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে বলে খবর। এরই মধ্যে কম করে ২০০ জনের শরীরের নমুনা সংগ্রহ করে করোনা সংক্রমণ হয়েছে কিনা তার জন্যে পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে ২৪ জনের শরীরে ওই সংক্রমণ হয়েছে বলে প্রমাণও মিলেছে। সংক্রমিতদের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করছে দিল্লি সরকার। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নিজামুদ্দিন মসজিদে তাবলিগের মার্কাসে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও এলাকার মুসলিমরা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এদের মাধ্যমে দেশে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন, হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কারণে ওই মসজিদ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলার ব্যাপারে। বিশাল ওই মসজিদে গত ৯ ও ১০ মার্চ তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে হাজার হাজার ভারতীয় এবং শত শত বিদেশি যোগ দিতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে ছয়জন মারা গেছেন তেলাঙ্গানায়। অন্যদিকে শ্রীনগরে মারা গেছেন একজন। ওই মসজিদ থেকে ফেরার পর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে ১০ জন শনাক্ত হয়েছে আন্দামান এবং নিকোবার দ্বীপে। ওই মসজিদে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, মিয়ানমার, কিরগিজস্তান, সৌদি আরব, আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, জেবুতি, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ফিজি, ফ্রান্স ও কুয়েত থেকে তাবলিগের সদস্যরা এসেছিলেন। ওই মসজিদে যারা যারা এসেছেন, তাদের সবাইকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে জানানো হচ্ছে।

অন্যদিকে করোনা সংক্রমণরোধ করতে হাওড়া হাসপাতালকে লক করে দিতে পারে স্বাস্থ্য ভবন। জানা গেছে, হাওড়া হাসপাতাল থেকে রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে গোটা হাসপাতালকে আইসোলেট করা হবে। করোনা ‘আক্রান্ত’ রোগিণীর চিকিৎসা ও মৃত্যুর ঘটনায়, চূড়ান্ত গাফিলতির অভিযোগে সকালে হাসপাতালে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন কর্মরত নার্সরা। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে খবর, সোমবার দিন হাসপাতালে থাকা রোগী, নার্স, চিকিৎসক এবং কোন কোন রোগীর আত্মীয় হাসপাতালে প্রবেশ করেছেন, বেরিয়েছেন, কোন কোন অ্যাম্বুলেন্স ও চালক এসেছেন- গেছেন এবং অন্যান্য আর কে কে প্রবেশ করেছেন, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত তালিকা তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এদিকে রাজ্যে আরো তিনজনের শরীরে মিলেছে নোভেল করোনাভাইরাসের জীবাণু। আক্রান্তদের মধ্যে দুজন কলকাতার, একজন মেদিনীপুরের। ফলে রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হলো ২৭ জন।

এদিকে নিজামউদ্দিন মসজিদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া মসুল্লিদের মধ্যে দিল্লি ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আরো ৩৫ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। এই সম্মেলনের জেরেই দেশে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। জানা গেছে, দিল্লির লোকনায়ক হাসপাতালে ভর্তি ১০২ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। গতকাল মঙ্গলবার তাদের মধ্যে ২৪ জনের পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। নিজামউদ্দিন মসজিদ থেকে এনে রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালেও অনেককে ভর্তি করা হয়েছিল, তাদের রিপোর্ট এখনো আসেনি। সেই রিপোর্ট এলে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়তে পারেই মনে করছে রাজ্য প্রশাসন। অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও ১১ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে বলে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর মিলেছে। ওই জমায়েত থেকে তেলঙ্গানায় ফেরা ছজনের মৃত্যু হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরে মৃত্যু হয়েছে আরো একজনের। আন্দামান নিকোবরে ফিরে যাওয়া ১০ জনের করোনা সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি দেশ-বিদেশের কয়েকশ’ মানুষ। এরই মধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ওই মসজিদ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লির নিজামউদ্দিন মসজিদে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল তবলিগি জামাত। তাতে দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার মানুষ ছিলেন। ওই অনুষ্ঠান শেষে তারা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গিয়েছিলেন। যেমন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন তেলঙ্গানায়। এদিকে দিল্লির নিজামউদ্দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গেরও বেশ কয়েকজন। তাদের প্রত্যেকেরই করোনা পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব। এদের সবাইকেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গেরও কয়েকশ’ মানুষ গিয়েছিলেন দিল্লির ওই সভায় যোগ দিতে। তাদের একটি অংশ এরই মধ্যে ফিরেও এসেছেন বাংলায়। আর সেটাই রাজ্য প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তারা। রাজ্য সরকার এরই মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওই ধর্মীয় সভায় যাওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু করেছে। মঙ্গলবার রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় টুইট করে জানিয়েছেন, এ রাজ্য থেকে দিল্লির তবলিগ জামাতে যাওয়া প্রত্যেককে চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের করোনা পরীক্ষার পাশাপাশি ১৪ দিনের জন্য বাধ্যতামূলক কোয়রান্টাইনে পাঠানো হবে।

এদিকে দিল্লির আরো এক মহল্লা ক্লিনিকের ডাক্তারের করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। এই নিয়ে এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বার দিল্লির মহল্লা ক্লিনিকের চিকিৎ?সকের করোনাভাইরাসের পরীক্ষার ফল পজিটিভ এসেছে। এর আগে দিল্লির মৌজপুরে কমিউনিটি ক্লিনিকের এক ডাক্তার, তার স্ত্রী ও কিশোরী কন্যার করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। মহল্লা ক্লিনিকের দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর-পূর্ব দিল্লির বাবারপুরে। বাবারপুর মৌজপুর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। ১২ থেকে ২০ মার্চের মধ্যে এখানে যতজন চিকিৎ?সার জন্য এসেছিলেন, তাদের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই চিকিৎ?সক সম্প্রতি বিদেশ থেকে ফিরেছেন, নাকি বিদেশ ফেরত কারোর সংস্পর্শে এসেছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ১০ মার্চ সৌদি আরব থেকে ফেরা এক মহিলার থেকেই প্রথম সংক্রমণ ছড়ায় দিল্লির মৌজপুরের মহল্লা ক্লিনিকে। যে চিকিৎ?সককে ওই মহিলা দেখিয়েছিলেন, মহল্লা ক্লিনিকের ওই ডাক্তারেরও করোনা ধরা পড়ে। এদিকে মহল্লা ক্লিনিকগুলো বন্ধ এখনই বন্ধ করা হবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

অন্যদিকে রাজস্থানের জয়সলমীরে ইরান থেকে ফিরিয়ে আনা ৯ জনের দেহে ধরা পড়েছে করোনাভাইরাস। করোনা অধ্যুষিত ইরান থেকে নানা ধাপে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল ৪৮২ জন ভারতীয়কে। তাদের জয়সলমীরের সেনা কোয়ারেন্টাইন ফ্যাসিলিটি সেন্টারে রাখা হয়েছিল। সেখানে নিয়ে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে তাদের স্ক্রিনিং করা হয়েছিল। দেশজুড়ে ছয়টি কোয়ারেন্টাইন ফ্যাসিলিটি সেন্টার চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। দিল্লির কাছে হিন্দান, গুরগাঁওয়ের মানেসর, জয়সলমীর, যোধপুর, মুম্বাইয়ের ঘাটকোপার ও চেন্নাইয়ে রয়েছে এই সেন্টারগুলো। ইতালি, ইরান ও মালয়েশিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা ১ হাজার ৫৯ জনকে এই সেন্টারগুলোতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

 

"