বাড়ি ফিরলেন কারামুক্ত খালেদা জিয়া

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুই বছর এক মাস ১৬ দিন পর গুলশানের নিজ বাসভবন ফিরোজায় পা রাখলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ সাত বছর যে ভবনটি থেকেই বিরোধী দলের রাজনীতির কলকাঠি নেড়েছেন, কারাবন্দি থাকায় দুই বছরেরও বেশি সময় সেই বাড়ি থেকেই দূরে ছিলেন তিনি। সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের মুক্তি পেয়ে সেই ফিরোজাতেই প্রত্যাবর্তন করলেন একাধিকবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়ার পরনে ছিল গোলাপি রঙের পোশাক ও কালো চশমা। গতকাল বুধবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের এনইডি-১ নম্বর বাড়ি ফিরোজার পথে রওনা দেন খালেদা জিয়া। তাকে আনতে যান ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, বোন সেলিমা ইসলাম ও বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান। এছাড়া ডা. হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত মেডিকেল টিমের সদস্যরাও ছিলেন। শামীম ইস্কান্দারের জিম্মাতেই খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হয়। তার প্রাইভেট কারে চড়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল থেকে নিজ বাসভবনে যান বেগম জিয়া। গত বছরের এপ্রিল থেকে কারাবন্দি খালেদা জিয়া এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এদিকে দুপুর আড়াইটার দিকে স্বজনদের গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে ঢোকার পরই কয়েকশ’ নেতাকর্মী সেখানে জড়ো হন। স্বজনেরা সেখানে পৌঁছানোর মিনিট দশেক আগে আসেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লক থেকে বের হন বিকাল সোয়া ৪টায়। তিনি বেরিয়ে আসার পরপরই হাসপাতালের ভেতরেই তার গাড়িকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের প্রচন্ড ভিড় জমে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে নির্দেশনা, সে কথা কারো মাথায় ছিল বলে মনে হয়নি।

খালেদা জিয়া বিএসএমএমইউ থেকে বের হওয়ার পর গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মোটরসাইকেলে এবং একটি বড় অংশ মানুষ হেঁটে এগোতে থাকে। কারো কারো হাতে ছিল হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড। নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের লাঠিপেটা শুরু করে। মঙ্গলবার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পরপরই দলের নেতাকর্মীরা বিএসএমএমইউর সামনে যান। গতকাল দুপুর ১২টায় প্রথমে বিএনপিপন্থি চিকিৎসক সংগঠনের সদস্য ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন।

বিকালে সবাইকে নিয়ে খালেদা জিয়া যখন গুলশানে ফিরোজায় পা রাখেন তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এছাড়া খালেদা জিয়ার গাড়ির সঙ্গে হাসপাতাল থেকেই সঙ্গী হন দলীয় নেতাকর্মীরা। তারা গোটা রাস্তা সেøাগান দিতে থাকেন। পথে কারওয়ানবাজারে পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের ওপর মৃদু লাঠিচার্জও করে। তবে সেখানে তেমন একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শেষবারের মতো ফিরোজায় ছিলেন খালেদা জিয়া। ওই দিন রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালতে হাজির হয়েছিলেন তিনি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সেদিন তার পাঁচ বছরের কারাদন্ডের আদেশ দেন বিচারক। সাজা ঘোষণার পর আদালত থেকেই পুরান ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। শুরু হয় সাজার মেয়াদ। ওই দিন থেকেই শূন্য খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ফিরোজা। এরপর আদালতের প্রাঙ্গণে দীর্ঘ দুই বছর ঘুরেও জামিন মেলেনি খালেদা জিয়ার। গত বছরের এপ্রিলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় তার। এরপর ভর্তি করা হলো বিএসএমএমইউ হাসপাতালে। উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়ার কারণ দেখিয়েও জামিন হয়নি। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় দেশ যখন ১০ দিনের সাধারণ ছুটির পথে, তখন মঙ্গলবার ঘোষণা এল, নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত হচ্ছে। দুই শর্তে ছয় মাসের জন্য মুক্তি পাচ্ছেন খালেদা জিয়া।

সেই আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কারা মহাপরিদর্শক ও জেল সুপারের কার্যালয় ঘুরে পৌঁছাল বিএসএমএমইউতে। বিকাল ৪টায় হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলেন খালেদা জিয়া। ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের গাড়িতে চড়ে রওনা হলেন গুলশানে নিজ বাসভবন ফিরোজার পথে। বিকাল সাড়ে ৪টা নাগাদ দুই বছর এক মাস ১৭ দিন পর ফের ফিরোজায় পা পড়ল খালেদা জিয়ার। খালেদা জিয়া না থাকলেও অবশ্য ফিরোজাকে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেই রেখেছেন এমন দাবি ভবনটিতে নিয়োজিতদের। তবে খালেদা জিয়ার মুক্তির খবরে তারা আরো একটু নড়েচড়ে বসেন গত মঙ্গলবার থেকে। পুরো বাড়ি ফের ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। খালেদা জিয়া এসে পৌঁছালে তার যেন কোনো সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করেন নিয়োজিতরা। গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও ফিরোজায় গিয়ে সবকিছুর দেখভাল করেন।

খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুর্নীতির মামলায় সাজা ভোগ করছেন। শারীরিক নানা সমস্যা নিয়ে তিনি প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন। তবে বিএসএমএমইউর উপাচার্য কনক কান্তি বড়–য়া বলেছেন, খালেদা জিয়া তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ শুনছেন না। শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরে আইনজীবীরা একাধিকবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন করেন। প্রতিবারই তা নাকচ হয়ে যায়। মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ ব্রিফিং করে ছয় মাসের জন্য দন্ড স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে মুক্তির ঘোষণা দেন।

অবশেষে দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর গতকাল বিকাল সোয়া ৪টার দিকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজন সেল থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এর আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির আদেশ আইজি প্রিজনের কাছে পৌঁছে। সেখান থেকে এটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপারের কাছে যায়। কারা কর্তৃপক্ষ এই আদেশ বিএসএমএমইউতে নিয়ে যান। এরপর তার মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বেগম খালেদা জিয়ার বয়স ও মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকার তাকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছিল। এই আবেদনে সাড়া দিয়ে সরকার মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়।

 

 

"