জ্বলছে দিল্লি, নিহত ৩৭

রাষ্ট্রপতিকে সোনিয়ার স্মারকলিপি অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:৪৩

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

হিংসার আগুনে জ্বলছে দিল্লি। মৌজপুর, ব্রহ্মপুরী, ভজনপুরা চক, গোকুলপুরীসহ দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় চলছে দফায় দফায় সংঘর্ষ। রাজধানীতে হিংসার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। উত্তরপূর্ব দিল্লিতে চলতি হিংসায় শেষ পরিসংখ্যান অনুসারে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত দুই শতাধিক। দিল্লির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। শোক প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

এদিকে দিল্লির সংঘর্ষের ঘটনা জাতীয় লজ্জা বর্ণনা করে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের জন্য রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সহ দলের শীর্ষ নেতারা। এক্ষেত্রে কেন্দ্রের বিজেপি এবং দিল্লির আমআদমি পার্টি সরকারকে ঘটনার জন্য কাঠগড়ায় তুলেছে কংগ্রেস। গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি ভবনে ডেপুটেশন শেষে সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, দেশের নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি রক্ষায় সুনিশ্চিত করতে আবেদন জানানো হয়েছে। হিংসা রুখতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, চার দিন ধরে দিল্লির বুকে যে তান্ডব চলেছে তা ভীষণ উদ্বেগের। এই ঘটনা জাতীয় লজ্জা। তার কথায়, হিংসা মোকবিলায় কেন্দ্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ। দিল্লির হিংসার ঘটনায় নীরব দর্শক কেন্দ্র ও দিল্লি সরকার। রাইসিনা হিলসে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পর সোনিয়া গান্ধী দুটো কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতিকে। দেশের মানুষের নিরাপত্তা যেন সুনিশ্চিত থাকে। কারো যেন প্রাণ না যায়। আর দ্বিতীয়ত দিল্লিতে হিংসার ঘটনা রুখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পুরোপুরি ব্যর্থ। তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে অবিলম্বে সরানো হোক। সোনিয়া রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন, তিনি যেন সরকারকে বলেন রাজধর্ম পালন করতে।

অন্যদিকে, দিল্লিতে সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন যে বার্তা দিয়েছে তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত সরকার। কমিশনের তরফে বলা হয়, মুসলিমদের ওপর আঘাতের আবহে, ভারত সরকারের উচিত, ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায়, দিল্লি সংঘর্ষ নিয়ে করা মন্তব্যকে ঘটনাগতভাবে বেঠিক, ভুল বোঝানো এবং রাজনীতিকরণের চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছে সরকার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন, সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং বেশ কয়েকজন ব্যক্তির দিল্লিতে হিংসা নিয়ে মন্তব্য দেখা হয়েছে। এগুলো ঘটনাগতভাবে বেঠিক, ভুল বোঝানো এবং ইস্যুকে রাজনীতিকরণের পদক্ষেপ। দিল্লিতে হিংসা ছড়িয়ে পড়া এবং মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বেরিন স্যান্ডার্স এবং সেখানকার প্রথমসারির বেশ কয়েকজন নেতা। যদিও ওইসব নেতাদের সম্পর্কে বিশদে কিছু জানায়নি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মার্কিন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের চেয়ারপারসন বলেছেন, দিল্লিতে যে সংঘর্ষ চলছে এবং আক্রমণের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, বাড়ি, দোকানপাট এবং প্রার্থনাঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে তা খুবই খারাপ। যেকোনো দায়িত্ববান সরকার সত্বর প্রয়োজন ধর্মের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

এদিকে গতকাল সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। আইবি আধিকারিক অঙ্কিত শর্মার খুনে মদদ আছে আপ নেতা তাহির হুসেনের নিহতের পরিবারের তরফে এমন দাবি তোলা হয়েছে। সেই অভিযোগের জবাবে সরব হয়েছেন আপের আহ্বায়ক তথা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। আপ নেতা তাহির হুসেন প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তার নাম না নিয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, হিংসায় মদদে যদি তার মন্ত্রিসভার কেউ জড়িত থাকেন তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। দলের কেউ জড়িত থাকলে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন জাতীয় নিরাপত্তা ও হিংসা ছড়ানোর স্বার্থে এই ধরনের ঘটনা ঘটানো উচিত না। বিষয়টা নজরে এসেছে, এই বিষয়গুলো নিয়ে রাজনীতি করা উচিত না।

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে আপ নেতা তাহির হুসেন বলেছেন, ২৪ তারিখ থেকে ঘর ছাড়া, পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন। স্টেশন হেডের নির্দেশে গিয়েছিলেন গাড়ি সরাতে। আর স্ত্রী গিয়েছিলেন ঘর থেকে কিছু জিনিস আনতে।

ওদিকে আবার নেতাদের উসকানিমূলক মন্তব্যের জন্য কোনো এফআইআর দায়ের করল না দিল্লি পুলিশ। আদালতে তারা জানিয়ে দিয়েছে, দিল্লির যা পরিস্থিতি তাতে এখনই এফআইআর দায়ের করলে তা শান্তি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে সহায়ক হবে না। গতকাল দিল্লি হাইকোর্ট পুলিশকে এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে নির্দেশ দিয়েছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশ এ কথা জানায়। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার আর্জি মেনে কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি পক্ষ হিসাবে মামলার অন্তর্ভুক্ত করেন বিচারপতি ডিএন পটেল এবং সি হরিশঙ্করের ডিভিশন বেঞ্চ। ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারকে সময় দিয়েছেন আদালত। তার মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয়েছে। উসকানিমূলক মন্তব্যের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে তাও জানাতে হবে সরকারকে। বিজেপি নেতাদের উসকানিমূলক মন্তব্য সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া এবং তারপর উত্তর-পূর্ব দিল্লি জুড়ে গত রোববার রাত থেকে হিংসা, গোষ্ঠী সংঘর্ষের সময় নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে দিল্লি পুলিশের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠছে। সেই সংক্রান্ত একটি আবেদনের শুনানিতে দিল্লি পুলিশকে ভর্ৎসনা করেন বিচারপতি এস মুরলিধর। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, অনুরাগ ঠাকুর, প্রবেশ বর্মা ও অজয় বর্মার বিরুদ্ধে কেন এফআইআর দায়ের হয়নি, দিল্লি পুলিশের কাছে তা জানতে চান তিনি। এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন। এফআইআর না হলে তার ফল কী হতে পারে তাও পুলিশকে ভেবে দেখতে বলেন তিনি। কিন্তু বুধবার রাতেই বিচারপতি মুরলিধরকে বদলি করা হয়। মামলার শুনানি করার ভার পড়ে বিচারপতি ডিএন পটেলের ওপর। সেখানে দুপুরে শুনানি শুরু হলে দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দেয়, হিংসার ঘটনায় এখনো পর্যন্ত ৪৮টি এফআইআর দায়ের করেছে তারা। কিন্তু এখনই উসকানিমূলক মন্তব্যের জন্য কোনো এফআইআর দায়ের করা ঠিক হবে না। কারণ এই মুহূর্তে তা শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় খুব সহায়ক হবে না।

ট্রাম্পকেও কটাক্ষ করে কবিতা মমতার

এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও কটাক্ষ করে কবিতা লিখলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই দিনের ভারত সফরের সময়ই সব থেকে বেশি জ্বলছিল দিল্লি। যা নিয়ে প্রশ্নও করা হয়েছিল স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। উত্তর এসেছিল, এগুলো ভারতের ব্যক্তিগত হিংসার ফল। তারা নিজেরাই বুঝে নেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রতিক্রিয়া নিয়ে কবিতার মাধ্যমে আক্রমণ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শিরোনামহীন কবিতা। তবে সেই জায়গায় রয়েছে, একটি জিজ্ঞাসা চিহ্ন। মমতা লিখছেন, তিনি এলেন, বললেন এবং চলে গেলেন/আমার মাতৃভূমি জ্বলতে থাকল/বিচলিত শঙ্কিত উদ্বিগ্ন/হৃদয় আমার ক্রন্দন রত/মৃত্যু মিছিল বেড়ে চলল। সেই লেখার অনুবাদও তিনি করেছেন ইংরেজিতে। এর আগে দিল্লির হিংসা নিয়েও একটি কবিতা লিখেছিলেন মমতা, নাম দিয়েছিলেন নরক। তারও আগে সিএএ, এনআরসির বিরুদ্ধেও কবিতা লিখেছেন মমতা। কবিতার নাম অধিকার।

 

"