এবার করোনার হানা দক্ষিণ কোরিয়ায়

আমিরাতে এক বাংলাদেশি আক্রান্ত

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

এক দিনের ব্যবধানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। গতকাল শনিবার দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন গত শুক্রবার থেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ২২৯ জন। এ নিয়ে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সহকারী স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিম গ্যাং-লিপ বলেছেন, প্রাদুর্ভাব ‘মারাত্মক নতুন ধাপে’ প্রবেশ করেছে। চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে আসার খবরের মধ্যে প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ায় উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। এখন পর্যন্ত দেশটিতে দুজন মারা গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এই সংখ্যা আরো বাড়বে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দায়েগু এবং নিকটবর্তী চেয়োংদোর হাসপাতালগুলোকে ‘স্পেশাল কেয়ার জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দায়েগু শহরের রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছে। গতকাল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০০ ছাড়ানোর পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী চুং সাই-কিউন দেশটিতে গণস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের দায়েগু এবং চেংডু শহর দুটিকে ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। দায়েগু শহরের রাস্তা এখন পুরো ফাঁকা। দেশটির রাজধানী সিউলের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

চীনের মূল ভূখ-ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও এশিয়ার অন্যান্য দেশে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেওয়ায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। প্রাণঘাতী এ ভাইরাস ইতোমধ্যে ছড়িয়েছে ২৯ দেশে। আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৭৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বে এ ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৬০ জনে, যাদের মধ্যে ১৫ জন ছাড়া বাকি সবার মৃত্যু ঘটেছে চীনে। তাদের মধ্যে ইরানে চারজন, জাপানে তিনজন, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দুজন করে এবং ফিলিপাইন, ফ্রান্স, তাইওয়ান ও ইতালিতে একজন করে আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার চিকিৎসাকর্মীরা গতকাল প্রথমে নতুন ১৪২ জন রোগীর সংক্রমণের কথা জানায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর আরো ৮৭ জন আক্রান্তের কথা জানানো হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (কেসিডিসি) জানিয়েছে, নতুন আক্রান্ত ২২৯ জনের মধ্যে ৯৫ জন চেয়োংদো শহরের দায়েনাম হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট। বর্তমানে এই হাসপাতালে মোট ১১৪ জন আক্রান্ত রোগী রয়েছে। এর মধ্যে ৯ জন হাসপাতাল কর্মী এবং ১০২ জন রোগী।

কেসিডিসি জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে দায়েগু শহরের একটি খ্রিস্টান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা একটি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর ভাইরাসটির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, ওই জনগোষ্ঠীর ৯ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে আলাদা স্থানে রাখা হয়েছে। এছাড়া ৫০০ জনেরও বেশি মানুষের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, এ রোগ যাতে অন্যান্য দেশে মহামারি আকার না নেয় সেজন্য এখনই সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস। তার মতে, এখনো এই ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে যত সময় যাচ্ছে, সুযোগ ততই কমে আসছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে দেশটির কওম শহর থেকে। সেখান থেকে মানুষের চলাচলের মধ্য দিয়ে ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে তেহরান, বাবোল, আরাক, ইসফাহান, রাস্তাসহ অন্যান্য শহরে। সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে। তাদের মধ্যে তেহরানের এক শহরের মেয়রও রয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

এদিকে কওম শহরে কাজ করা চীনা শ্রমিকদের কাছ থেকেই এ ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে ধারণা করছেন ইরানের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। কেবল গত শুক্রবারই সেখানে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ওই শহরে সব ধর্মীয় সমাবেশ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে চীন বা অন্য কোন বিষয়ের সঙ্গে স্পষ্ট যোগসূত্র নিশ্চিত হতে না পারায় ভাইরাসটিতে আক্রান্তের কিছু সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান। ডা. টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস বলেন, ভাইরাসটিকে ঠেকানোর মতো সুযোগ সীমিত বা ‘সংকীর্ণ’ হয়ে আসছে। গত শুক্রবার, এএনএসএ সংবাদ সংস্থা বলছে, ইতালির চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৭৮ বছর বয়সি একজন দেশটিতে মারা গেছে।

অযথা আতঙ্ক বিপদ ডেকে আনবে : আইইডিসিআর

নতুন করোনাভাইরাস নিয়ে অযথা আতঙ্ক রোগটি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে বলে আবারও হুশিয়ার করেছে আইইডিসিআর। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, অযথা যেন গুজব না ছড়ায় সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিদেশি নাগরিক বা বিদেশ ফেরত অনেকে নানা রকম হেনস্তার শিকার হচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অতি উৎসাহী লোকের বাড়াবাড়ি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। আমাদের কাছে তথ্য এসেছে বাড়িওয়ালারা তাদের বাসায় ঢুকতে দিচ্ছে না। একজন চীনা নাগরিক তার ভাড়া করা বাসায় উঠতে গেলে তাকে উঠতে দেওয়া হয়নি। তিনি পরে একটি হোটেলে রাত কাটিয়েছেন।

কারো এ ধরনের কাজ পুরো দেশকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে মন্তব্য করে অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, কেউ সত্যিই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে এবং হেনস্তার কারণে তাকে বাইরে থাকতে হলে রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমরা বলেছি যারা চীন থেকে এসেছেন, তারা যেন বাসায় থাকেন। তাকে ঢুকতে না দিয়ে সারা বাংলাদেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে দিলাম! কারো মধ্যে যদি আসলেই এ রোগের লক্ষণ থাকে, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে তিনি কিন্তু তা গোপন করবেন। দেশে এ পর্যন্ত ৭৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারো শরীরে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েনি বলে জানান আইইডিসিআর পরিচালক।

তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরে যে পাঁচ বাংলাদেশি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আছেন, তাদের অবস্থা অপরিবর্তিত। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন, তবে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো তার বিষয়ে আশা ছাড়েনি। সিঙ্গাপুর ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক প্রবাসী বাংলাদেশি নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

 

"