মরণ সাগর পারে তোমরা অমর...

‘ভাষার বিকৃতি চাই না’

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

‘কেউ কথা রাখেনি, আটষট্টি বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি, কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা গেল, কিন্তু সেই কথা রাখতে আর এলো না কেউ, সাতষট্টি বছর ধরে প্রতীক্ষায় আছি’Ñ এই প্রতীক্ষা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া মানুষের স্বজনদের। মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রথমবার মানুষ মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে। সেই মানুষের পরিচয় বাঙালি। যাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তাইতো বিশ্বকবি গেয়ে গেছেনÑ ‘মরণ সাগর পারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি। নিখিলে রচিয়া গেলে আপনারই ঘর, তোমাদের স্মরি’। কিন্তু সেসব বাঙালির পরিবার-পরিজনের খোঁজ কেউ নেন না। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই তাদের কথা মনে আসে। ক্ষোভ আছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিয়েও। তাদের স্বজনরা বলছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য কোটা থাকলেও ভাষাশহিদদের ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কোনো সদস্যকে দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে এক রকম অনাদর ও অবহেলায় কাটছে তাদের স্বজনদের দিনকাল।

এদিকে রক্তে কেনা বাংলা ভাষা অযতেœ-অবহেলায় বিকৃত হবে, ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি বানানো হবে, তা চান না শহিদদের পরিবারের সদস্যরা। তারা বলেন, অনেকে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে স্টাইল করে জগাখিচুড়ি মার্কা কথা বলেন। এতে শুধু ভাষার সৌন্দর্যই নষ্ট হয় না, অসম্মানও হয়। ভাষার এই বিকৃত উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। কেউ যদি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে, সেক্ষেত্রে সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত।

ভাষাশহিদ আবদুস সালাম : আবদুস সালাম ১৯২৫ সালে ফেনীর দাগনভূঞার লক্ষণপুর গ্রামে (সালামনগর) জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মো. ফাজিল মিয়া, মা দৌলতুন্নেসা। তিনি ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। শহিদ আবদুস সালাম ২১ ফেব্রুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে গুলিবিদ্ধ হন। তখন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে চিকিৎসাধীন দেড় মাস পর ৭ এপ্রিল তিনি মারা যান। আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার স্মৃতি রক্ষায় গ্রামে ভাষাশহিদ সালাম স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর করা হলেও সেটি সব সময় তালাবদ্ধ থাকে।

আবদুস সালামের পরিবার : ভাষাশহিদ আবদুস সালামের ৪ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে ছোট ভাই আবদুল করিম বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, ভাষাশহিদ পরিবারের একজন সদস্য ও ভাষাশহিদ সালামের ছোট ভাই হতে পেরে আমি গর্ববোধ করি। কিন্তু যে ভাষার জন্য আমি আমার ভাইকে হারালাম, সে ভাষা যখন কেউ বিকৃতভাবে উচ্চারণ করে, তখন খুব কষ্ট পাই।

শহিদ আবদুল জব্বার : শহিদ আবদুল জব্বার ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মো. হাসেম আলী শেখ, মাতার নাম সাফিয়া খাতুন। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করতেন। ১৫-১৬ বছর বয়সে তিনি ট্রেনে করে নারায়ণগঞ্জ আসেন। সেখানে জাহাজঘাটে এক ইংরেজ সাহেবের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং চাকরি নিয়ে মিয়ানমার যান। ১০-১২ বছর পরে তিনি গ্রামে ফিরে একটি দোকান দেন। এরপর তিনি আমেনা খাতুনকে বিয়ে করে। ঘর আলোকিত করে পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্র্রুয়ারি তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত শাশুড়িকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করে আবদুল জব্বার ওই কলেজের ছাত্রবাসে গফরগাঁওয়ের হুরমত আলীর কক্ষে উঠেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে তিনি কী হয়েছে দেখার জন্য কক্ষ থেকে বের হন। এ সময় পুলিশের গুলি এসে তার বুকে বিদ্ধ হয়।

পরিবারের অবস্থা : ভাষাশহিদ আবদুল জব্বারের নামে গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। রাজধানীর তেজকুনিপাড়ার বাড়িতে থাকেন শহিদ জব্বারের একমাত্র ছেলে নুরুল ইসলাম বাদল ও তার পরিবার।

শহিদ জব্বারের ছেলে নুরুল ইসলাম বাদল বলেন, সারা বছর আমাদের কেউ খোঁজ নেন না। তিনি ভাষাসৈনিকদের স্বজনদেরও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের দাবি জানান।

সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) থেকে মো. রকিবুল হাসান বিশ্বাস জানান, ভাষাশহিদ রফিক উদ্দিন আহমদ ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় পারিল বলধারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রফিক উদ্দিনের পিতার নাম আবদুল লতিফ ও মাতার নাম রাফিজা খাতুন। তার পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যবসায়ী, কলকাতায় ব্যবসা করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রফিক উদ্দিনের পিতা ঢাকায় আসেন। এখানে বাবুবাজারে আকমল খাঁ রোডে পারিল প্রিন্টিং প্রেস নামে ছাপাখানা চালু করেন। বায়রা স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করে রফিক উদ্দিন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। আইকম পর্যন্ত পড়ে ঢাকায় প্রেস ব্যবসা শুরু করেন। পরে জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে তিনি ওই কলেজের ছাত্র ছিলেন। এদিকে, রফিকের একই গ্রামের মেয়ে রাহেলা খাতুন পানুর সঙ্গে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিয়ের শাড়ি-গহনা নিয়ে তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বাড়ি না গিয়ে তিনি ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মিছিলে অংশ নেন। মিছিলে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। এ অবস্থায় ভীত হয়ে নির্বিচারে ছাত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। একটি গুলি রফিক উদ্দিনের মাথায় বিদ্ধ হয়।

শহিদ রফিকের স্মৃতি : ২০০৮ সালের ১৫ মে ভাষাশহিদ রফিক উদ্দিন আহমদের স্মৃতিকে চিরজাগ্রত রাখতে তার জন্মস্থান সিংগাইরের বলধারা ইউনিয়নের পারিল গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর করা হয়েছে এবং সেখানে গড়ে উঠেছে শহিদ রফিক গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।

১৯৫২ থেকে ২০২০ সাল পেরিয়ে গেছে কয়েকটি যুগ। বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষা করতে শহিদ রফিকের ছোট ভাই মৃত আবদুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম (৭২) বাস করছেন এখানে। তিনি বলেন, এই বাড়ির স্মৃতি রক্ষায় আমাকে এখানে থাকতে হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব মানুষ এসে শহিদ রফিক সম্পর্কে তথ্য চাচ্ছেন, তা দিতে দিতেই আমি ক্লান্ত। তবে আমি অসুস্থ। সবাই আসেন সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে। কেউ আমাদের খবর রাখেন না। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের কথা মনে পড়ে। রফিকের ছোট ভাইয়ের ছেলে শাহজালাল ওরফে বাবু তার স্ত্রীও আছেন এই বাড়িতে।

শহিদ রফিকের ভাই খোরশেদ আলম বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের চাকরিতে কোটা থাকলেও ভাষাশহিদদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য কোটা নেই। তাছাড়া চিহ্নিত হয়নি ভাষাশহিদ রফিকের কবর, অরক্ষিত জন্মভিটাও। ভাষা দিবস এলে শহিদ রফিক স্মৃতি জাদুঘরে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু পরিবারের খবর নেয় না কেউ।

তবে শহিদ রফিকের নামে মানিকগঞ্জের প্রধান সড়ক, সিংগাইর শহিদ রফিক সরণি নামকরণ করা হয়। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ-সিংগাইর-হেমায়েতপুর সড়কে ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজটির নামকরণ করা হয়।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার তোবারক হোসেন লুডু বলেন, শহিদ রফিকের বসতবাড়িতে ভবন করতে সরকার উদ্যোগ নিলে সম্ভব।

শহিদ আবুল বরকত : আবুল বরকত ১৯২৭ সালের ১৬ জুন ভারতীয় উপমহাদেশের (অবিভক্ত) মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মৌলভী শামসুদ্দীন সাহেবের জ্যেষ্ঠপুত্র। তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দ্বিতীয় বিভাগে চতুর্থ স্থান লাভ করেন। এরপর তিনি একই বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। ৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি কলেজের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ বুলেট এসে তার শরীরে বিদ্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

শহিদ আবুল বরকতের পরিবারের বর্তমান অবস্থা : শহিদ আবুল বরকতের ভাতিজা মো. আলাউদ্দিন বরকত জানান, বরকত শহিদ হওয়ার পর সম্পত্তি বিনিময় করে তাদের পরিবার আসে গাজীপুরে। ১৯৬৮ সাল থেকেই ভারত থেকে তাদের পরিবারের সদস্যরা গাজীপুরের চান্দনা গ্রামে বাস করছেন।

শহিদ বরকতের ভাতিজা আইনউদ্দিন বরকত বলেন, ভাষাশহিদদের স্মরণে বাংলা একাডেমি সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে বইমেলাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও তাদের দাওয়াত দেওয়া হয় না। জেলা প্রশাসনও নেয় না খোঁজখবর।

শহিদ শফিউর রহমান : ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শফিউর রহমান পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার কোন্নগরে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ থেকে তিনি আইকম পাস করেন। অতঃপর চব্বিশ পরগনার সিভিল সাপ্লাই অফিসে চাকরি শুরু করেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার তমিজউদ্দিন আহম্মেদের মেয়ে আকিলা খাতুনকে বিয়ে করেন। পরে বাবার সঙ্গে তিনি ঢাকায় এসে টেলিগ্রাফ অফিসে চাকরি নেন। শফিউর রহমানের পাঁচ ভাই ছিল। আসজাদুর রহমান নামে তার এক ভাই সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তেন। ২১ ফেব্রুয়ারি শফিউর রহমান সকালে অফিসে রওনা হন। এ সময় নবাবপুর রোডে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভরত জনতার ওপর পুলিশ বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। শফিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হন।

শহিদ অহিউল্লাহ : ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শহিদ হয় একজন নয় বছরের ছেলে, যার নাম অহিউল্লাহ। তিনি ছিলেন হাবিবুর রহমানের ছেলে। হাবিবুর রহমান পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন। ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। নবাবপুর রোডের খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ানো অহিউল্লাহর মাথায় সরাসরি গুলি আঘাত হানে।

শহিদ আবদুল আউয়াল : আবদুল আউয়াল পেশায় একজন রিকশাচালক ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ২৬ বৎসর। তিনি শহিদ হন ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যখন ছাত্র বিক্ষোভ চলছিল, তখন আবদুল আউয়ালও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার পিতার নাম মোহাম্মদ হাশিম। শহিদ আউয়ালের ঢাকার ঠিকানা ছিল ১৯, হাফিজুল্লাহ রোড।

 

 

"