চসিক ও ৫ আসনে উপনির্বাচন

আস্থাভাজনরাই পেলেন আ.লীগের মনোনয়ন

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

কাজী মনসুর আহমেদ ও জিয়াউদ্দিন রাজু

শূন্য হওয়া পাঁচ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ক্লিন ইমেজ এবং আস্থাভাজন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গত শনিবার রাতে দলের মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকের পর প্রার্থী চূড়ান্ত করে আওয়ামী লীগ। আর এর মাধ্যমে প্রার্থিতা নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলা নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান হলো। তবে অন্য আসনগুলোর চেয়ে ঢাকা-১০ আসন ও চট্টগ্রামের মেয়র পদের মনোনয়নের বিষয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কোন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড প্রার্থী বাছাই করল, সেটি তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। যদিও মনোনয়নের ব্যাপারে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরই সবাই আস্থা রেখেছেন। মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতা এ বিষয়ে জানান, শূন্য হওয়া পাঁচ আসনের জন্য প্রার্থীদের আমলনামা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার হাতে। তিনি বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে একাধিক সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে যোগ্য ও আস্থাভাজন প্রার্থীদেরই বেছে নিয়েছেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেলেন না বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তার জায়গায় মহানগর আওয়ামী লীগের ক্লিন নেতা রেজাউল করিম চৌধুরীকে প্রার্থী করছে ক্ষমতাসীন দল।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ছেড়ে দেওয়া এ আসনটিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যবসায়ী শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি এফবিসিসিআইয়ের সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতি ছিলেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ছিলেন।

ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট, হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ আসন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটিতে একজন ব্যবসায়ীকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে। কয়েকজন নেতা বলেছেন, ঢাকা-১০ আসনে সাবেক এমপি তাপসের পরিবারের বাইরে গিয়ে এমন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। এখন দেখার বিষয় একজন ব্যবসায়ী কীভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ আসনটি পরিচালনা করবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৪২ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছি, কিন্তু এমন গুরুত্বপূর্ণ আসনে এভাবে ব্যবসায়ীদের মনোনয়ন দিলে ভবিষ্যতে আমরা রাজনীতি করে কী ফল পাব? উত্তর সিটির মেয়রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে পুনর্নির্বাচিত হন। তার আগে মেয়র হয়েছিলেন সাবেক তৈরি পোশাকশিল্পের আরেক উদ্যোক্তা প্রয়াত আনিসুল হক। তাহলে দলের সৎ, পদবঞ্চিত ও ত্যাগী কর্মীদের কী হবে?

অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নতুন মুখ মনোনয়ন পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী দলের ত্যাগী নেতা রেজাউল করিম চৌধুরীর ওপরই আস্থা রেখেছেন। যদিও তার নামটি ছিল আলোচনার বাইরে। দলের মনোনয়ন আবার পাওয়ার জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করেও সফল হননি বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। কারণ দু-এটি উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে বিরোধ এবং নগরীতে জলাবদ্ধসহ নানা বিষয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন মেয়র নাছির। তার জায়গায় মনোনয়ন পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেয়র পদের জন্য সবচেয়ে বেশি অনুরোধ গেছে আ জ ম নাছির ও আবদুস ছালামের জন্য। কিন্তু এই দুজনের কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন না শেখ হাসিনা। তাদের দুজনের একজনকে মেয়র এবং অন্যজনকে করেন সিডিএর চেয়ারম্যান। মেয়র ও সিডিএ চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাদের সব আমলনামা নেত্রী অবহিত হন। দল ও কাজের চেয়ে তারা নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তাই দলের জন্য ত্যাগী ও সৎ নেতাকে বেছে নিতে বলেন। দলের বিভিন্ন সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে প্রধানমন্ত্রী রেজাউল করিম চৌধুরীকেই এ দলের মেয়র পদে মনোনয়নের উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া রেজাউল করিম চৌধুরীকে এক পরীক্ষিত নেতা বলে গতকাল রোববার মন্তব্য করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রেজাউল করিম চৌধুরী কোনো দিন কোনো সুযোগ পাননি। কিন্তু সারা জীবন দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। সেই পুরস্কার হিসেবে তাকে চট্টগ্রামের মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হলো।

মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। মেয়র নির্বাচিত হলে সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব। আমার লক্ষ্য থাকবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন। মেয়র নির্বাচিত হলে চট্টগ্রামের উন্নয়নই হবে আমার অন্যতম কাজ।

মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমের বিষয় চট্টগ্রামের স্থানীয় নেতা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আ জ ম নাছির মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। তিনি মেয়র হলে তার কর্মীরাই সুযোগ-সুবিদা পান। এ ছাড়া দলীয় কর্মী, তবে অন্য মতাদর্শী হলে তাদের নিয়ে ক্ষুব্ধ থাকতেন তিনি। প্রায়ত আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আ জ ম নাছিরের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এ কারণে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে নগর আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। অন্যদিকে, নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের ঠিকমতো মূল্যায়ন না করায় এই দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে ওঠে। দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে এই পক্ষ আ জ ম নাছির উদ্দিনের বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতার কারণেই দলীয় মনোনয়নে পিছিয়ে পড়েন তিনি।

আ জ ম নাছির মনোনয়ন না পাওয়ার ফলে চট্টগ্রামবাসী নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধি। মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরের দিন নগরের প্রতিটি চায়ের দোকান থেকে শুরু করে, শপিং মল পর্যন্ত সব স্থানে আলোচনার বিষয় ছিল দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি। নাছিরের কর্মীরা ক্ষুব্ধ হলেও নগরবাসী তাকে নিয়ে সমালোচনা করেছে।

ক্লিন ইমেজখ্যাত কে এই রেজাউল করিমÑ

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন রেজাউল করিম। ১৯৬৭ সালে কলেজে ছাত্রাবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সদস্যপদে ফরম পূরণের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬৯-১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১৯৭০-১৯৭১ সালে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রেজাউল করিম চৌধুরী। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৭-২০০৬ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক, ২০০৬-২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি নগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে বগুড়া-১ আসনে প্রয়াত সংসদ আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান মনোনয়ন পেয়েছেন। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটিতে আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগের জন্য অনেক ত্যাগ শিকার করেছেন। এর জন্য তার স্ত্রী এ আসনের মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন।

অন্যদিকে বাগেরহাট-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আমিরুল আলম মিলন। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ১৭ বছর মোরেলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ১৫ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার। যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে এ আসনটি শূন্য হয়। যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার মনোনয়ন পাওয়ায় শনিবার রাতে কেশবপুর এলাকায় আনন্দ মিছিল করেছেন তার সমর্থকরা।

গাইবান্ধা-৩ আসনে উম্মে কুলসুম স্মৃতি উপনির্বাচনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী। দুঃসময়ের এ নেত্রীর দক্ষতার পরিচয় দিয়ে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন এ আসনটিতে।

উল্লেখ্য, গত ২৭ ডিসেম্বর সংসদ সদস্য ইউনুস আলী সরকার, ১০ জানুয়ারি সংসদ সদস্য মোজাম্মেল হোসেন, ১৮ জানুয়ারি সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান এবং ২০ জানুয়ারি সংসদ সদস্য ইসমাত আরা সাদেক মারা যান। তাদের শূন্যতায় আসনগুলোতে উপনির্বাচনের পাল বইতে শুরু করেছে।

 

"