ঢাকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ শিগগিরই

* একনেকে অনুমোদন হলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে * ১২ দেশের ২৭ সংস্থার আবেদন জমা

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

হাসান ইমন

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৭ সালে পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ওই সময় ৮১ একর জায়গা অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় সংস্থাটি। পরে একই বছরের ২৮ মার্চ একনেকে অনুমোদন পেলেও জমি অধিগ্রহণের দাম দ্বিগুণ করায় সেপ্টেম্বরে আটকে যায় প্রকল্পটি। তবে আশার কথা, প্রকল্পটি এখন একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে কাজ দ্রুত শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে ৩১ একর জায়গা চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন দেশের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২টি দেশ থেকে ২৭ সংস্থার আবেদন জমা পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্যরে বিকল্প ব্যবহার শুরু না করলে ভবিষ্যতে মহাবিপদে পড়বে সিটি করপোরেশন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির আওতাভুক্ত এলাকায় দৈনিক ২ হাজার ৭০০ টন বর্জ্য থেকে ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। এর অর্ধেকের মতো বর্জ্য কোনো না কোনোভাবে থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্জ্য ফেলার স্থান মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলেও সংকুলান নেই। এ অবস্থায় নগরজুড়ে উৎপাদিত বর্জ্য শোধন করে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিন্তাভাবনা আসে। ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। পরে একই বছরের সেপ্টেম্বরে জমি অধিগ্রহণের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় আবার আটকে যায় প্রকল্পটি। এখন প্রকল্পটির ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকায়। দ্বিতীয়বারের মতো টাকা অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রকল্পটি এখন একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭টি আবেদন পড়েছে। এসব আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে দু-তিনটি আবেদন বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। তবে একনেক অনুমোদন দিলেই আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। পরে ডিজাইনের কাজ ও তা যাচাই-বাছাইয়ের পর এলজিইডি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে দ্রুত আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

জানা যায়, জমা পড়া আবেদনের দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। বাংলাদেশের কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রিনটিচ, রান করপোরেশন ও সানজিন+ফরসিবেল। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ প্রতিষ্ঠান বিঅ্যান্ডএফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। এ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ার এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবল সলিউশন (ইএমএসইউএস), ভিয়েনার আইভেনিও কনসাল্ট জিএমবাহ, যুক্তরাজ্য ও কানাডার যৌথ প্রতিষ্ঠান ন্যনুটেক (এশিয়ান অ্যান্ড সেনটিনেল), যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়ার হাউস এনার্জি, লেবানের গ্রিন এনার্জি অর্গানিক ফুয়েল প্রডাকশন, জাপানের চাউস্টার ইনসিনারেশন ও এরাটা ইন্টারন্যাশনাল কো. লিমিটেড, সিঙ্গাপুরের ন্যাটকো (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, চীনের সিএনবিএন ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কো. ডলমিটেড, টাস-সাউন্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসোর্স কো. লিমিটেড, নিউস্কাই (চীন) এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড টিস কো. লিমিটেড, জিসিকে ইন্টেলিজেন্ট এনার্জি কো. লিমিটেড, গ্রিন টেকনোলজি লিমিটেড, ইউডি এনভায়রনমেন্টাল ইকুয়েপমেন্ট টেকনোলজি কো. লিমিটেড ও হংকংয়ের কেনবেস্ট এনভায়রনমেন্ট (ওবারসেস) কোম্পানি লিমিটেড। আর যুক্তরাজ্যের গ্রিন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ইউকে লিমিটেড, ব্লু রে ইউএসএ (বিডি) লিমিটেড, ক্লাইড পুটার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট, অস্ট্রিয়ার গ্রিন পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, থাইল্যান্ডের সাইও ট্রিপল এ গ্রুপ, কানাডার ট্রিটেক রক ইলি মেনিটোবা, সুইডেনের বাপাবমিলিজো।

জানা যায়, ১৯৯০ সালে মাতুয়াইলে ৫০ একর জমির ওপর ল্যান্ডফিল গড়ে ওঠে। ২০০৫-৬ অর্থবছরে আরো ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ১০০ একরে সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তীতে রাজধানীতে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্ত হয়। জাতীয় সংসদে আইন করে আগের সিটি করপোরেশন বিলুপ্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন করা হয়। সংস্থাটির ল্যান্ডফিলের জন্য বর্তমানে ১০০ একর জমি থাকলে তা অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। নতুন করে করে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য আরো ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা চলছে। ঢাকা দক্ষিণের ৮১ একর জমির মধ্যে ৫০ একর ল্যান্ডফিল ও ৩১ একর জায়গা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবহার করা হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৮১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পটি এখন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আগামী একনেকে প্রকল্পটি পাস হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির টাকা আগে অনুমোদন হওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি ডিও লেটার পাঠাব।

এ বিষয় নিয়ে নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য দুই সিটি করপোরেশন নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করলেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই জমিগুলো ভরাট হয়ে যাবে। এ সমস্যাগুলো দূর করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর পরিণতি বরণ করতে হবে।

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার করে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস তৈরির কথা বলা হচ্ছে। এটা করা সম্ভব হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টেকসই রূপ পাবে। আর সেটা না করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে আবর্জনা ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খাবে।

 

"