অগ্নিকাণ্ডে বাড়ছে প্রাণহানি

* গত বছরে ২৪ হাজার ৭৭ অগ্নিকাণ্ড মৃত্যু ২১৩৮ * শীতে দরজা-জানালা বন্ধে দুর্ঘটনা বেশি * অসচেতনতাই মূল কারণ

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অগ্নিকান্ডের ঘটনা। ফ্ল্যাট বাসার বদ্ধ ঘরে জমে থাকা গ্যাসে, চুলা কিংবা গ্যাস লাইনের পাইপের ফুটো থেকে নির্গত গ্যাসে এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অধিকাংশ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। আবার কলকারখানার অনিরাপদ সিলিন্ডার, ঘরের এসি বিস্ফোরণেও প্র্রাণহানি ঘটছে। শীতে দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি বেশি। এর ফলে প্রাণহানির সংখ্যাও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসতর্কতার কারণে এবং সরকারি সেবা সংস্থার নজরদারির অভাবে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। চলতি বছর ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় বেশকিছু ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার ভয়ংকর স্মৃতি এখনো বহন করছেন স্বজনরা।

গত ২ জানুয়ারি ভোরে রাজধানীর আফতাব নগরের একটি ফ্ল্যাটে এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন সাংবাদিকপুত্র স্বপ্নীল আহমেদ পিয়াস (২৬)। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ১৩৮ জন। দগ্ধ হন ১৪ হাজার ৯৩২ জন। আগুনের ঘটনায় ৩৩০ কোটি ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৪ টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের বার্ষিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এসব তথ্য মিলেছে।

দেশের ইতিহাসে আলোচিত কয়েকটি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ২০১৯ সালে। ‘পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা’ বনানীর ‘এফআর টাওয়ার’ ‘কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরে কারখানায়’ আগুনের ঘটনা পুরো জাতিকে হতবাক করে দিয়েছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ও জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারিতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনে নিহত হন ৭৮ জন। ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনে পুড়ে মারা যায় ২৬ জন। বছরের শেষদিকে ১১ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের প্রাইম প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে ৩১ জন দগ্ধ হয়। এর মধ্যে ২১ জন মারা যান। ১৫ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে গাজীপুর সদরের কেশোরিতা এলাকায় লাক্সারি ফ্যান কোম্পানি লিমিটেডের কারখানায় আগুন লেগে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হন ১৫ জন। ২০১৯ সালে নিহত ২১৩৮ জনের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ২৭৮ জন।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলেন, বেশিরভাগ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে গ্যাসের চুলা ও গ্যাস পাইপের লিকেজ থেকে বদ্ধ ঘরে জমে থাকা গ্যাসে। বিশেষ করে শীতের সময় রান্নাঘরের দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় লিকেজ দিয়ে বের হওয়া গ্যাস ঘরে জমা হয়। ভোরে রান্না করতে গিয়ে কিংবা সিগারেট ধরাতে আগুন জ্বালাতেই সেকেন্ডের মধ্যে আগুন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এ আগুন থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকে না। নষ্ট বৈদ্যুতিক তার এবং নষ্ট বোর্ড থেকেও দুর্ঘটনা ঘটছে। একটু সতর্ক হলেই অনেক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা এড়ানো সম্ভব। দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে গ্যাসের চুলা নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং চুলার পাইপ এক বছর পরপর পরিবর্তন করা দরকার। বৈদ্যুতিক তার ও সুইচবোর্ড নষ্ট হলে তা সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এবং তিন বছর অন্তর অন্তর পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন তারা।

জানা গেছে, দেশের বহুতল ভবন ও কলকারখানাসহ বাণিজ্যিক ভবনগুলোর প্রায় ৯০ ভাগেই অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ ভবন পুরোনো, সেখানে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সংযোজন করাও কঠিন। তাছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলেও আগুনের ঘটনা বাড়ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, আগুনের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বহুতল ভবনগুলোতে মহড়া দেওয়া, পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসার গ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। গ্যাসের চুলা কিংবা সিলিন্ডারে গ্যাস ব্যবহারকারীরা শুধু একটু সচেতন হলেই শতকরা ৩০ ভাগ দুর্ঘটনা কমে আসবে। কীভাবে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করতে হবে, রান্না শেষে কীভাবে সুইচ ঠিকমতো বন্ধ করা হয়েছে কিনা সেটার দিকনির্দেশনা গ্যাস কোম্পানির করা উচিত। গ্যাসের লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করার পাশাপাশি রান্নাঘরের জানালা কিছুটা খোলা রেখে নেট দিয়ে আটকে দেওয়া যেতে পারে। যাতে রান্নাঘরের মধ্যে বাতাস আসা-যাওয়া করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বদ্ধঘরের দরজা-জানালা খুলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট অপেক্ষার পর আগুন জ্বালাতে হবে। তিতাস গ্যাস কর্মকর্তারা জানান, চুলার ওপর কাপড় শুকাতে গেলেও দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় চুলা বন্ধ না করার ফলেও ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে।

পোড়া রোগী বিশেষজ্ঞ প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল বলেন, সম্প্রতি গ্যাসের আগুনে দগ্ধ রোগী বেড়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে প্রাণহানিও বেশি হয়। আগুনে পোড়া রোগীদের শরীরে ১৫-২০ মিনিট ধরে বিশুদ্ধ পানি ঢালতে হবে। এরপর দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের যত আগুনের ঘটনা ঘটেছে এর প্রায় ৩৯ শতাংশের জন্য দায়ী বিদ্যুতের শর্টসার্কিট। চুলা থেকে আগুন লেগেছে ২২.৭ শতাংশ। ২০১৯ সালের অগ্নিকান্ডের ঘটনার ভয়াবহতা হার মানিয়েছে অতীতের রেকর্ড। কেড়ে নিয়েছে বস্তি, ফুটপাত থেকে শুরু করে বহুতল ভবনে অবস্থান করা ২ হাজার ১৩৮ জনের প্রাণ। জানমালের ক্ষতিসহ চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন অনেকে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ।

 

"