উচ্ছেদ অভিযানের পর ফের স্থাপনা

দখলমুক্ত হচ্ছে না নদ-নদী

* ৫০ বছরে ধ্বংস হয়ে গেছে ৫২০ নদী * সারা দেশে ৪৯ হাজার ১৬২ জন দখলকারী চিহ্নিত

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

বারবার উচ্ছেদের পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না দেশের নদ-নদীগুলো। যেন চলছে উচ্ছেদ আর দখল খেলা। দখলের কারণে একই স্থানে বারবার অভিযান চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। আর এতে একই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে সময়, অর্থ এবং জনবল। তাই নদ-নদীগুলো দখল এবং দূষণমুক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা আর বালু নদ-নদীর অবস্থা ‘ত্রাহি মধুসূদন’। তবে আশার কথাও আছে, নদ-নদীগুলোর হারানো রূপ ফিরিয়ে দিতে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে নদীতীরে সীমানা খুঁটি স্থাপন এবং পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে খনন চলছে। এরপর হাঁটার পথ, সবুজায়ন, ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির মতে, ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প শেষ হলে নদীতীরগুলো হয়ে উঠবে ঢাকাবাসীর বিনোদনের জায়গা।

জানা গেছে, শিশু একাডেমি প্রকাশিত শিশু বিশ্বকোষে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা বলা হয়েছে ৭০০-এর অধিক। ড. অশোক বিশ্বাস নদীকোষ শীর্ষক গ্রন্থেও সাত শতাধিক নদীর সংখ্যা উল্লেখ আছে। মোকারম হোসেন বাংলাদেশের নদী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা হাজারটি। মাহবুব সিদ্দিকী আমাদের নদ-নদী গ্রন্থে লিখেছেন নদ-নদীর সংখ্যা সহস্রাধিক।

নদী গবেষকরা মনে করেন, একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের ভূখন্ডে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। তখন নদীগুলো ছিল প্রশস্ত গভীর ও পানিতে টইটুম্বর। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের তথ্য মতে দেশে এমন নদীর সংখ্যা ২৩০টি। কিন্তু সরকারি হিসাবে (শুধু গ্রীষ্মকালে পানি থাকে) এমন নদীর সংখ্যা ৩২০টি। তবে বর্তমানে ১৭টি নদী চরিত্র হারিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। ৫০ বছরে ধ্বংস হয়ে গেছে ৫২০টি নদী। আশঙ্কা করা হচ্ছে, কয়েক বছরের মধ্যে আরো ২৫ নদী হারিয়ে যাবে। আর সারা দেশে ৪৯ হাজার ১৬২ জন নদী দখলকারীকে চিহ্নিত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এদিকে রাজধানী ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা আর বালু নদ-নদী ঘিরে মহাপরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি বিআইডব্লিউটিএ নদীতীর অবৈধ দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। উচ্ছেদে ভাঙা পড়ে প্রভাবশালীদের আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। ৫০ দিনের ওই অভিযানে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে ৪ হাজার ৭৭২ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উদ্ধার হয় তীরভূমির ১২১ একর জায়গা। তবে এসব অভিযানে বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে সংস্থাটিকে। দখলদারদের হামলায় আহত হয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। বুড়িগঙ্গায় উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে দখলদারদের হামলার শিকার হয়েছেন সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান। হামলা হয়েছে উচ্ছেদে নেতৃত্বদানকারী সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের ওপরও।

কিন্তু এই অভিযান ‘একপা এগোলে দুইপা পিছিয়ে যায়’। মাত্র ছয় মাস আগেই উত্তরার ধওড় এলাকায় তুরাগতীরে অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে বিআইডব্লিউটিএ। এর কয়েক দিনের মধ্যেই আবার গড়ে ওঠে অবৈধ কাঁচাবাজার। ফলে একই স্থানে আবার অভিযান চালায় বিআইডব্লিউটিএ, গুঁড়িয়ে দেয় প্রায় ২০০ স্থাপনা। এছাড়া টঙ্গী কাঁচাবাজারের ভবনটি এর আগেও ভাঙা হয়েছিল দুইবার। কিন্তু দুই মাস আগে প্রথমবার ভবনটির একপাশ ভেঙেছিল বিআইডব্লিউটিএ। এভাবে যতবারই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে ততবারই নতুন স্থাপনা বানিয়ে দখল করা হয়েছে। এছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সব ময়লা-আবর্জনা সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে ভরাট হওয়ায় গত বুধবার ফেরত আসতে হয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’কে। নগরবাসী ও বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তুরাগ দখল হয়ে গেছে। দেখলে মনে হবে বিশাল ভাগাড় বা বর্জ্যরে ডাম্পিং স্টেশন। অথচ এ তুরাগকে ক’দিন আগে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত।

এদিকে, দেশের ৬৪ জেলায় ৪৯ হাজার ১৬২ জন অবৈধ নদ-নদী দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছে বলে গত ২৩ জানুয়ারি সংসদে জানিয়েছিলেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, দেশের সব জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তুতকৃত তালিকা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা তথ্য বাতায়নে আপলোড করে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এতে সারা দেশে ৪৯ হাজার ১৬২ জন অবৈধ দখলদারের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলায় উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর থেকে বিশেষ উচ্ছেদ অভিযানে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর সময়ে ১ হাজার ২৭টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ২১ দশমিক ৫ একর তীরভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সারা দেশে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় বুড়িগঙ্গার মতো সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। অবৈধভাবে নদী এবং খাল দখলকারী যেই হোক না কেন কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অবৈধ দখলদার যেই হোক সবাইকে উচ্ছেদের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

বিআইডব্লিউটিএ-র যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদীবন্দরের নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, নদীতীরের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত আছে, থাকবে। নতুন করে আর ওইসব জায়গা দখলের সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক বৈঠকে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ বন্ধ ও নাব্য ফিরিয়ে এনে নদী রক্ষায় টাস্কফোর্স গঠন করে দেন। এ কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এরপর গত বছরের ৯ এপ্রিল থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ।

 

"