কাউন্সিলর নির্বাচন

জটিল সমীকরণে ভোটের মাঠ

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

হাসান ইমন

আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থীরা ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। পিছিয়ে নেই বড় দুই দলের কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। তারাও সশরীরে উপস্থিত থেকে এবং মাইকে গান বাজিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। তবে শঙ্কার বিষয় হলো বড় দুই দলেরই বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা রয়েছেন মাঠে। তাদের মধ্যে কেউ স্থানীয় রাজনৈতিক আশ্রয়ে, আবার কেউ বড় কোনো নেতার কথায়, কেউ আবার দলের স্থানীয় অসন্তুষ্ট গ্রুপের প্রশ্রয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন। এতে দুই সিটির ভোটের মাঠে সৃষ্টি হয়েছে জটিল সমীকরণ।

আর বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে বিব্রত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দুই দফায় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে বিদ্রোহীদের নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দেওয়া হয়েছে কঠোর বার্তা। নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করলে তাদের বিরুদ্ধে শিগগির বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে মদদদাতাদের বিরুদ্ধেও। এমন কঠোর বার্তা সত্ত্বেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি অনেকেই। আর এই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ভোটের মাঠে কোথাও সুযোগ নিতে পারে বিএনপি। আবার কোথাও আওয়ামী লীগ। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীরা না বসলে বিএনপি প্রার্থীরা সুযোগ বেশি নেবেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তত ২২টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ এবং ১৭টি ওয়ার্ডে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। আর ঢাকা দক্ষিণে ৩৫টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের এবং ১৩টি ওয়ার্ডে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের যেসব নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন তাদের কারণে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাবে বলে এই প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার শঙ্কা পেয়ে বসেছে। তবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেও দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে যেসব ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন সেসব ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীরা অনেকটা নির্ভার রয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দিচ্ছেন কেন্দ্রের কয়েকজন নেতা বলে অভিযোগও উঠেছে।

ডিএসসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বর্তমান কাউন্সিলর মোহাম্মদ হাসান পিল্লু। এ ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম। এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এই ওয়ার্ড থেকেই দলের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হন হাসান। তবে দলীয় সমর্থন পাওয়ার পরও জোরালোভাবে মাঠে নামতে পারছেন না হাসান পিল্লু। তার সমর্থকদের মারধর করাসহ ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী মামাতো ভাই ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমার কাউন্সিলর হাসান পিল্লু বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর কারণে দলের নেতাকর্মীদের এলাকাছাড়া করা হচ্ছে। অনেককে মারধর করে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বাড়িতে। কেউই মাঠে নামতে পারছে না। প্রচার চালাতে দেওয়া হচ্ছে না। সমর্থকদের পরিবারকে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। যেখানে এমপির ছেলেই বিদ্রোহী প্রার্থী, সেখানে সে তো দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে সুবিধা পাবেই। এটাই স্বাভাবিক। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী ইরফান সেলিম। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবারে বড় হয়েছি। এই ওয়ার্ডের সমস্যা, সম্ভাবনার কথা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানার কথা না। তাই আমি নির্বাচন করছি। দল থেকে এই পর্যন্ত আমার কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তাছাড়া যেখানে জনগণ আমাকে চাচ্ছে, সেখানে আমি কেন সরে দাঁড়াব।

এদিকে মামা, মামাতো ভাই আর ভাগ্নের মধ্যে যখন এমন দূরত্ব চলছে সেই হিসেবে এখানে বাড়তি সুবিধায় আছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও একই ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াসের।

উত্তরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। এখানে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন রবিন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন মাহাফুজ হোসেন খান সুমন, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন দলটির আরেক নেতা আমজাদ হোসেন মোল্লাহ।

রূপনগর এলাকার চা দোকানি সেকান্দার আলীর মতে, দুই দলের একাধিক প্রার্থী থাকায় নির্বাচনের পরিবেশ ‘গরম’। তিনি বলেন, কাউন্সিলররা তো মাঠ গরম কইরা রাখছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ ভোট চাইতে আসে। সারা দিন এলাকায় মাইক বাজে।

২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদুর রহমানকে প্রথমে সমর্থন দিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল। পরে বর্তমান কাউন্সিলর মো. নাছিরের ওপরই ভরসা রাখে তারা। জাহিদুর রহমানও নির্বাচনের মাঠ ছাড়েননি। ভোটের লড়াইয়ে আছেন বিএনপি সমর্থিত মিজানুর রহমান বাচ্চু। এখানে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছেন কড়াইল এলাকার দোকানি আলমগীর হোসেন। ফাইট হবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর মধ্যে। জাহিদুর ভাই হয়ত কিছু ভোট কাটবে। এখানে তুমুল প্রচারণা চলছে, বলেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর মোকাদ্দেস হোসেন। এখানে বঙ্গবন্ধু পরিষদের লালবাগ থানার সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দুজনের কারণে বিএনপির প্রার্থী মোশাররফ হোসেন খোকন কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন আমলীগোলা এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের হেরে তো অনেকবার সতর্ক করা হইছে, কিন্তু হেয় তো বয় না। দুইজনের ঠেলাঠেলির কারণে ওই দিকে খোকন আবার পাস করে যায় কি না কে জানে!’

৬৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সাধারণ সম্পাদক আকবর হোসেন নান্টু। মনোনয়ন চেয়ে না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এই ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. নূর উদ্দিন মিয়া। এখানে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হচ্ছে বলে জানান বামৈল বাজারের ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন। তার মতে, ‘কাউন্সিলর প্রার্থীরাই এলাকার নির্বাচনের পরিবেশ জমিয়ে রেখেছেন। মেয়র প্রার্থীরা তো আসে নাই এখন পর্যন্ত। আওয়ামী লীগের লোকজন কিছু মিটিং করে, বিএনপির কেউ মাঠেই নামে না। তবে কাউন্সিলর প্রার্থীরাই নির্বাচন জমাইয়া রাখছে। লাস্ট পর্যন্ত নির্বাচনটা ভালোমতো শেষ হইলেই হয়!’

 

"