৩০ বছর পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন

সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল

৪ আসামির দায় স্বীকার

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

হত্যাকাণ্ডের ৩০ বছর পর আসল রহস্য উন্মোচন হলো। এই সময়ে ২৫ জন তদন্ত কর্মকর্তা রহস্য ভেদ করতে না পারলেও মাত্র ১৮০ দিনে ঘটনার পেছনের ঘটনাসহ আদ্যপান্ত বের করে আনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় ১৯৮৯ সালে রিকশাযোগে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিকে যাওয়ার সময় সগিরা মোর্শেদ সালাম (৩৪) নামে এক গৃহবধূ গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পিবিআই। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো আনাস মাহমুদ ওরফে রেজওয়ান (৫৯), ডাক্তার হাসান আলী চৌধুরী (৭০) ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদ ওরফে শাহীন (৬৪) এবং মারুফ রেজা।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের সদর দফতরে সংস্থা প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আসামিদের জবানবন্দির ভিত্তিতে ৩০ বছর ছয় মাস আগের এই হত্যাকা-টি সচিত্র প্রতিবেদন (স্কেচ) আকারে প্রকাশ করেছে পিবিআই। পিবিআইয়ের প্রধান বলেন, পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে ঘটেছিল এ হত্যাকাণ্ড। কিন্তু এটিকে সুপরিকল্পিতভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবুও বিষয়টি আরো অধিকতর তদন্তের জন্য আমরা আদালতের কাছে দুই মাস সময় চেয়েছি।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকাল ৫টায় সগিরা মোর্শেদ সালাম বাসা থেকে বের হয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছিলেন তার দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যায়নরত বড় মেয়ে সারাহাত সালমাকে (৮) বাসায় আনতে। স্কুলের সামনে পৌঁছামাত্রই অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতিকারীরা তার হাতের বালা ধরে টান দেয়। চুড়ি দিতে অস্বীকার করায় সগিরাকে গুলি করা হয়। খুনিদের ছোড়া গুলি তার ডান হাতে ও বুকে লাগে। পরে তাকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী আবদুস সালাম চৌধুরী রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কেন এই হত্যাকাণ্ড এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বনজ কুমার বলেন, নিহত সগিরা ও গ্রেফতার সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন সম্পর্কে জা। সগিরার স্বামী আবদুস সালাম চৌধুরীরা তিন ভাই। সালাম সবার ছোট। কিন্তু তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই সবার চেয়ে বেশি উচ্চশিক্ষিত। এটি নিয়ে তাদের পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল মেজ ভাই বারডেম হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহীনের সঙ্গে। তারা স্বামী-স্ত্রী ছোট ভাইয়ের এমন উন্নতি সহ্য করতে পারেনি। তাই সগিরাকে শায়েস্তা করার জন্য মারুফ রেজাকে কন্টাক্ট করে ডা. হাসান আলী। এ কাজে সহযোগিতা করে তার রোগী প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আনাস মাহমুদ রেজওয়ান। আর আনাস মাহমুদের মাধ্যমে হত্যার কাজটি পায় মারুফ রেজা। সে অনুযায়ী মারুফ রেজা প্রথমে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন। বাধা দেওয়ার পর সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে। এতেই তিনি মারা যান।

পিবিআই জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পর ক্রমান্বয়ে ২৫ জন তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করলেও হত্যার প্রকৃত কারণ ও আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার ৩০ বছর পর মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। দায়িত্ব পাওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এই হত্যায় জড়িত চারজনকে গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে।

এদিকে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজারবাগে নিজেদের বাসার তৃতীয় তলায় স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীনের প্রস্তাবে ডা. হাসান আলী তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সগিরা মোর্শেদকে ভয়ভীতি ও হেনস্তা করে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করে। একই বাসার সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীনের ভাই আনাস মাহমুদ রেজওয়ানকেও পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়। এরপর হাসান আলী ও রেজওয়ান মিলে সগিরা মোর্শেদকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৩ জুলাই ডা. হাসান আলী নিউ ইস্কাটনের যমুনা ফার্মেসিতে পূর্বপরিচিত মারুফ রেজার সঙ্গে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ জুলাই দিন নির্ধারণ করে তারা।

নিজের মেয়েকে স্কুল থেকে আনার জন্য রিকশাচালক ছালাম মোল্লার রিকশা ভাড়া করে সিদ্ধেশ্বরী যান সগিরা মোর্শেদ। তাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য মারুফ রেজার সঙ্গে যায় আনাস মাহমুদ। মৌচাক মার্কেটের সামনে মারুফ রেজার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আনাস মাহমুদের। দুজন একসঙ্গে মোটরসাইকেলে চড়ে ভিকারুননিসা স্কুলের গেটের সামনে এসে পাঁচ থেকে সাত মিনিট অপেক্ষা করে। এরপর সেই পথে রিকশায় আসেন সগিরা মোর্শেদ। আনাস মাহমুদ রিকশায় থাকা সগিরা মোর্শেদকে চিনিয়ে দেয় মারুফ রেজাকে। এরপর দুজন মিলে সগিরা মোর্শেদের রিকশা ফলো করতে করতে যায়। কিছু দূর যাওয়ার পর রিকশার গতিরোধ করে আটকায় তারা।

মারুফ রেজা সগিরা মোর্শেদের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় এবং হাতে থাকা স্বর্ণের বালা ধরে টানাটানি করে। এ সময় পাশে থেকে মারুফ রেজাকে সহযোগিতা করে আনাস মাহমুদ। আনাস মাহমুদকে দেখে সগিরা মোর্শেদ চিনে ফেলেন। তিনি আনাসের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘আমি তোমাকে চিনি, এই তুমি তো রেজওয়ান, তুমি এখানে কেন?’ সগিরা মোর্শেদ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে পিস্তল বের করে মারুফ রেজা। সগিরা মোর্শেদকে গুলি করা হয়। প্রথম গুলিটি লাগে সগিরা মোর্শেদের ডান হাতের কনুইয়ের ওপর। দ্বিতীয়বার আবারও গুলি করা হয়। দ্বিতীয় গুলিটি বুকে লাগে। বুকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। সগিরা মোর্শেদকে দুই রাউন্ড গুলি করার পর এর আগে ছিনিয়ে নেওয়া ব্যাগ ফেলে দিয়ে ফাঁকা আরো এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে মারুফ রেজা। এরপর মোটরসাইকেলে চড়ে মারুফ ও আনাস পালিয়ে যায়। দুজনকে পালিয়ে যেতে দেখে পিছু ধাওয়া করে রিকশাচালক ছালাম মোল্লা। হাতে ইট নিয়ে হাইজ্যাকার হাইজ্যাকার বলে চিৎকার করতে করতে যায় বেইলি রোডের মহিলা সমিতি পর্যন্ত। ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন রকিবুল হাসান রুমি নামের একজন চিকিৎসক। তিনি সগিরা মোর্শেদকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে নিজের গাড়িতে উঠিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর রিকশাচালক ছালাম মোল্লা যান রমনা থানায়।

 

"