জামিন শুনানি : বিচারপতিদের এজলাস ত্যাগ

খালেদার আইনজীবীদের হট্টগোল

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানিতে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের চিৎকার ও হট্টগোলের মধ্যে এজলাস ছেড়ে চলে যান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। গতকাল বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন দিতে রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পর চিৎকার ও হট্টগোল শুরু করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। সে সময় আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করছিলেন আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ আগামী বুধবারের মধ্যে মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়ে জামিন শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন। এরপর থেকেই তুমুল চিৎকার ও হট্টগোল করতে থাকেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরাও চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলতে থাকেন, ‘আমারা কোর্ট থেকে যাব না, কোর্ট ছাড়ব না।’ এভাবে প্রায় ১৫ মিনিট চিৎকার ও হট্টগোলের প্রেক্ষাপটে সকাল ১০টার দিকে এজলাস থেকে উঠে চলে যান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন

ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। এরপরও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতে বসে থাকেন।

এর আগে গত ২৮ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন চান আপিল বিভাগ। অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে মানবিক কারণে জামিন দিতে খালেদার আইনজীবীর আবেদনের পর ওইদিন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে আদালতে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে এই মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। সে খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে গত ১৪ নভেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন করে জামিন চান খালেদা জিয়া।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর এ মামলায় সাত বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। সেই আপিলে বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার রায় বাতিল এবং মামলা থেকে খালাস চাওয়া হয়। সেই সঙ্গে জামিন আবেদনও করা হয়।

এর আগে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আখতারুজ্জামান খালেদা জিয়াকে এ মামলায় সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন। মামলার বাকি সব আসামিকেও একই সাজা দেওয়া হয় এবং ট্রাস্টের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ঘোষণা করেন আদালত। ওই রায়ে বলা হয়, সার্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণে যা মনে হয়, প্রত্যেক আসামিই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এতে তারা সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এ কারণে খালেদা জিয়াসহ চার আসামিকেই সংশ্লিষ্ট আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে ছিলেন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর সাবেক এপিএস জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার এপিএস মনিরুল ইসলাম। এর আগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজার রায় ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউ হাসপাতালে রয়েছেন।

বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের হট্টগোল আদালত অবমাননার শামিল : অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা হট্টগোল করে আদালতের ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। তাদের এ তৎপরতা আদালত অবমাননার শামিল। গতকাল সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গত ২৮ নভেম্বর খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন করা হয়েছিল বিশেষভাবে তার স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে। তখন আপিল বিভাগ তার স্বাস্থ্যের বর্তমান অবস্থা জানতে চেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে একটি স্বাস্থ্যগত রিপোর্ট চেয়েছিলেন। বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেহেতু খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে, তাই এর রিপোর্ট দিতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। আদালত যখন এ বিষয়টি জানিয়ে আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বৃহস্পতিবার শুনানির দিন ধার্য করলেন, তখনই বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতে চরম হট্টগোল ও গন্ডগোল শুরু করলেন।

মাহবুবে আলম বলেন, তারা যে বিশৃঙ্খলার শুরু করেছেন, এটা নজিরবিহীন। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ন্যক্কারজনক। জনসভায় যেমন হট্টগোল হয়, তেমন হট্টগোল আদালতে করেছে। আদালতের ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টির জন্য বাইরের আন্দোলনকে এজলাসের মধ্যে নিয়ে এসেছে। তাদের বিশৃঙ্খলার জন্য আদালত এক পর্যায়ে উঠে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এটা অতি ন্যক্কারজনক এবং যা আদালত অবমাননার অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানাই। এভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

সংবাদ সম্মেলনে আরে বক্তৃতা করেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা সুপ্রিমকোর্টে আগে কখনো দেখিনি। একজন ব্যক্তি বিচারের জন্য সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তার পক্ষে তার আইনজীবীরা আবেদন করেছেন জামিনের জন্য। তাদের দরখাস্তের জন্যই সুপ্রিমকোর্ট মেডিকেল রিপোর্ট চেয়েছিলেন। মেডিকেল রিপোর্ট না আসায় তারা আজকে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা সত্যিই দুঃখজনক। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমিন উদ্দিন বলেন, এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রতি তাদের অনাস্থা প্রমাণ করল। তারা যে আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না, সেটাই প্রমাণিত হলো। তারা আইন-আদালতকে মানে না।

আইনজীবী সমিতির সভাপতি বলেন, প্রধান বিচারপতির প্রতি অনুরোধ জানাব, আদালতে এমন আচরণ করলে শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিন। আজকে অনেকেই আইনজীবী ছিল না। অনেকেই বহিরাগত ছিল। কালো কোট পরে ঢুকে পড়েছিল। কোনো আইনজীবী আদালতে এ ধরনের সেøাগান দিতে পারে না।

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, খালেদা জিয়ার জামিনের শুনানির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আদেশ দেওয়ার পরও বিএনপির ভাড়াটিয়া লোকজন দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান করা হচ্ছে। তারা আদালত প্রাঙ্গণকে অচল ও অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারায় লিপ্ত। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই, নিন্দা জানাই। ব্যারিস্টার তাপস বলেন, আইন অঙ্গনকে অচল করার যে কোনো অপচেষ্টা আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে রুখে দেওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন

এজলাসে হট্টগোল : অ্যাটর্নি জেনারেলকে দুষলেন বিএনপির আইনজীবীরা

দীর্ঘ তিন ঘণ্টা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে বিএনপির সমর্থক আইনজীবীদের অবস্থান করিয়ে বিচার কাজ বন্ধ রাখার ঘটনার জন্য বিএনপির আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন উল্টো রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলকেই দায়ী করেছেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগে হট্টগোলের পর সংবাদ সম্মেলন করে এ দোষারোপ করেন মাহবুব।

খালেদার জামিনের বিষয়ে শুনানি করতে গিয়ে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টা এজলাস কক্ষে অবস্থান করার পর এই ঘটনাকে নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করেছেন বিএনপির এ আইনজীবী।

জামিন আদেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির আইনজীবীরা চকলেট মুখে এজলাস কক্ষে অবস্থানের পাশাপাশি এক পর্যায়ে হট্টগোলের সৃষ্টি করেন। হইচই ও হট্টগোলের মধ্যে ১০টার পর এজলাস থেকে নেমে যান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ। এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার সময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, সব কিছুর সীমা থাকা উচিত। আপনারা এজলাস কক্ষে যে আচরণ করেছেন, তা নজিরবিহীন।

এ ঘটনায় সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ সফিউর রহমান মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আজকে যে ঘটনা ঘটেছে তার সব দায়-দায়িত্ব অ্যাটর্নি জেনারেলের। কেননা খালেদা জিয়ার মামলায় মেডিকেল রিপোর্টের দরকার হয় না। এ মামলায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। সাত বছরই তাকে দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আজকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাজতে রয়েছেন অথচ এ ধরনের মামলায় শত শত আসামি জামিন নিচ্ছেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, একটা মামুলি মামলায়, মিথ্যা অভিযোগে খালেদা জিয়াকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রায় এক বছর ১০ মাস ধরে জেলে। কেন এতদিনে তার জামিন হয়নি আজকে; আপনারা তা বুঝতে পারছেন। সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এবং এই কারণেই খালেদা জিয়ার মুক্তি এতদিন দেরি হয়েছে উল্লেখ করে মওদুদ আহমদ বলেন, আমি মনে করি, শুধুমাত্র মানবিক কারণে তার জামিন চাওয়া হয়েছে।

বিএনপির আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, আপনারা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছেন জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে মামলা দিয়ে জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। বেগম জিয়া ভালো মানুষ হিসেবে জেলখানায় গেছেন কিন্তু এখন তিনি চিকিৎসার অভাবে জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। তার যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা সেই চিকিৎসা তিনি জেলখানায় পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি আছেন, সেখানেও তিনি চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য আমাদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি তার আত্মীয়-স্বজনকেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না সেখানে।

 

"