এবার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ধর্মঘট

সড়ক আইন স্থগিতসহ শ্রমিকদের ৯ দফা দাবি

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরোধিতা করে বাস চলাচল বন্ধের দ্বিতীয় দিনে আরো নতুন নতুন এলাকা যোগ হয়েছে। এর বাইরে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপচালক শ্রমিকদের সংগঠন ৯ দফা দাবি সামনে এনে সারা দেশে পূর্ণ পরিবহনের ধর্মঘট ডেকেছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন আইন স্থগিত রাখাসহ নয় দফা দাবিতে আজ বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ডেকেছে সংগঠনটি। এদিকে সোমবার থেকে শুরু হওয়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১০টি জেলার পরিবহন শ্রমিকরা আজ থেকে কাজে নামার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার মালিক ও শ্রমিক নেতারা।

খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গার আন্তজেলা বাস টার্মিনাল থেকে বুধবার সব সড়কপথে বাস ছাড়বে। প্রশাসনের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাসচালকরা। খুলনা সার্কিট হাউস মিলনায়তনে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে জেলা প্রশাসন। বৈঠকে ২১ ও ২২ নভেম্বর নতুন নীতিমালা কিছুটা শিথিল করার আশ্বাস দিলে চালক ও মালিকরা বাস চালু করার সিদ্ধান্ত নেন।

এদিকে মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের রাজনীতিকে সমর্থন করেন না জানিয়ে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, সড়ক আইন সংস্কার করা হয়েছে। কষ্ট হলেও সবাইকে এ আইন মেনে চলার অনুরোধ করছি। আর আইন নিয়ে যদি কারো কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটা টেবিলে বসে সমাধান করা যেতে পারে। মানুষকে জিম্মি করে আমরা কোনো রাজনীতি সমর্থন করি না। পরিবহন ধর্মঘটের মাধ্যমে মানুষকে জিম্মি করে আন্দোলন আমরা অতীতেও সমর্থন করিনি, এখনো করি না। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন।

খুলনার মালিক সংগঠনগুলো বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও গতকাল থেকে সারা দেশের পরিবহন ধর্মঘটের পরিধি আরো বেড়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাকস্ট্যান্ডে অবস্থিত পরিষদের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান। তিনি সংবাদ সম্মেলনে ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। আন্দোলনরত শ্রমিক ও চালকরা সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর বেশ কিছু ধারায় সংশোধন দাবি করেছেন। তারা দাবি করেন যে, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ স্থগিত করে মালিক-শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জরিমানার বিধান ও দ- রাখতে হবে। নতুন আইনে যেসব জরিমানা ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে এ দেশের সাধারণ শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই শ্রমিকরা নতুন আইনের বিরোধিতা করে ৯টি দাবি উত্থাপন করেছেন।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে ‘সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা কমিটি’, ‘সড়ক পরিবহন আইনশৃঙ্খলা কমিটি’ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গঠিত যেকোনো পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্ট কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় চালককে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কোনো মামলায় চালক আসামি হলে তা অবশ্যই জামিনযোগ্য ধারায় হতে হবে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত দোষীকে চিহ্নিত করতে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের সংযুক্ত করে তদন্ত কমিটি গঠন করে সঠিক তদন্তের ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় কোনো গাড়ির মালিককে গ্রেফতার বা হয়রানি করা যাবে না।

বিআরটিএর মাধ্যমে নভেম্বর-২০১৯-এর আগ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন পাওয়া রফতানিযোগ্য পণ্য পরিবহন গাড়ির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা অপরিবর্তিত রেখে (ওই গাড়ির মডেল বাজারে থাকা পর্যন্ত) চলাচলের অনুমতি দিতে হবে।

সড়ক-মহাসড়ক ও হাইওয়েতে গাড়ির কাগজপত্র চেকিংয়ের নামে পুলিশি হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সব জেলা টার্মিনাল ও ট্রাকস্ট্যান্ড অথবা লোডিংপয়েন্টে গাড়ির কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স চেকিং করতে হবে। বিআরটিএর মাধ্যমে গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলে অযথা বিভিন্ন অজুহাতে পুলিশি মামলা করা চলবে না।

সহজশর্তে ও স্বল্প সময়ের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। যেসব চালক যেসব গাড়ি চালনায় পারদর্শী, তাদের সে ধরনের লাইসেন্স দিতে হবে। বর্তমানে হালকা পেশাদার লাইসেন্স দিয়ে ভারী যানবাহন চালানোর অনুমতি দিতে হবে। জরিমানা মওকুফ করে গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করার ন্যূনতম ছয় মাস সময় দিতে হবে। বিগত পণ্য পরিবহন আন্দোলনে এবং ধর্মঘটে যেসব মালিক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

সব জেলা শহর ও হাইওয়ে মহাসড়কের পাশে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক স্থানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসহ টার্মিনাল/স্ট্যান্ড নির্মাণ করতে হবে। টার্মিনাল নির্মাণের আগে রংপার্কিয়ের মামলা দেওয়া বা গাড়ি রেকারিং করা যাবে না।

পুরো দেশে এক নিয়মে একই ওজনে ওভারলোডিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মোটরযানের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী একটি বাস্তবসম্মত বোঝাই করা ওজনের হার নির্দিষ্ট করে ওভারলোডিং সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।

সড়ক-মহাসড়কে প্রতি ১০০ কিলোমিটার পরপর পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসহ বিশ্রামাগার ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত ফুটপাত, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস, জেব্রাক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্য ভিন্ন লেন বা রাস্তা তৈরি করতে হবে। নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ রেজিস্ট্রেশনবিহীন সব ধরনের যান মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে।

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো ঝিনাইদহের স্থানীয় সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবারও ঝিনাইদহ-যশোর, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গার অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে শ্রমিকরা। কবে নাগাদ বাস চলাচল শুরু হবে, তাও বলতে পারছে না তারা। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁয় অভ্যন্তরীণ সব রুটে গত দুদিন থেকে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিকল্প হিসেবে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে জেলার বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে জেলার ১১টি উপজেলার সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রীরা। ভোগান্তি নিরসনে দ্রুত প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন সচেতনরা। ধর্মঘটের কারণে অভ্যন্তরীণ সব রুটসহ নওগাঁ-রাজশাহী ও নওগাঁ-বগুড়া রুটে গত দুদিন থেকে বাস চলাচর বন্ধ রয়েছে।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে পাবনায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বাস চালক-শ্রমিকদের একাংশ কর্মবিরতি শুরু করেছে। এতে করে পাবনা থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু মালিকদের নিজ দায়িত্বে বাস চলতে দেখা গেছে। গতকাল সকালে পাবনার কেন্ত্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কর্মবিরতি উপেক্ষা করে মালিক ও চালক শ্রমিকদের একটি অংশ বাস চালাচ্ছেন। এদিকে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ঢাকাসহ দূরপাল্লার যাত্রীরা কিছুটা দুর্ভোগে পড়েছেন।

হিলি প্রতিনিধি জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের দাবিতে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর থেকে চতুর্থ দিনেও হিলি-বগুড়া রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন চালকরা। এতে করে বিপাকে পড়েছেন ওই পথে চলাচলরত যাত্রীরা। গত শনিবার সকাল থেকেই চালকরা নিজ নিজ গাড়ি বন্ধ রেখে এই কর্মসূচি পালন করছেন। এতে করে ওই পথে চলাচলরত যাত্রীরা বাস না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন, বিকল্প উপায়ে বাড়তি ভাড়ার মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, নতুন ট্রাফিক আইনের প্রতিবাদে গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে ঝালকাঠি-বরিশাল, ঝালকাঠি-ঢাকাসহ অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার ৯টি রুটে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। রুটসমূহ হলো ঝালকাঠি থেকে বরিশাল, বরিশাল থেকে ঝালকাঠি হয়ে খুলনা, বরিশাল থেকে ঝালকাঠি হয়ে পিরোজপুর, বরিশাল থেকে ঝালকাঠি হয়ে ভা-ারিয়া, বরিশাল থেকে ঝালকাঠি হয়ে মঠবাড়িয়া, বরিশাল থেকে ঝালকাঠি হয়ে পাথরঘাটা, ঝালকাঠি-আমুয়া, বরিশাল-ঝালকাঠি ও ঝালকাঠি-ঢাকার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।

"