বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-তল্লাশিতে আসতে পারে স্মার্টকার্ডের ব্যবহার

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা তল্লাশি সহজে পার হতে স্মাটকার্ডের (জাতীয় পরিচয়পত্র) ব্যবহার-উপযোগিতা দেখতে চান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদা। বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকরা বিদেশ ভ্রমণের সময় নিরাপত্তা তল্লাশিতে বিশেষ কার্ড (স্মার্টকার্ডের) দেখিয়ে মুহূর্তেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আধুনিক

প্রযুক্তির স্মার্টকার্ড থাকায় ওইসব দেশের মতো এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের সুযোগ রয়েছে, সে চিন্তা থেকে সিইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনু বিভাগকে নির্দেশনা দেন। এরই মধ্যে কমিশন প্রধানের নির্দেশনা বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এনআইডি উইং থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন এনআইডি উইংয়ের সহাকারী পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার হোসেন। তবে গত ১৫ অক্টোবর পাঠানো চিঠির কোনো জবাব বার্তা প্রেরক কর্তৃপক্ষ এখনো পাননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে, লন্ডনের হিথ্রো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর ও দুবাই বিমানবন্দরসহ বিশ্বের নামি-দামি অনেক দেশে বিমানবন্দরে নাগরিক স্মার্টকার্ড দেখিয়ে নিরাপত্তা চেকিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও সাংবিধানিক সংস্থা ইসির লক্ষ্য দুবাই বিমানবন্দরে বাংলাদেশিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত স্মাটকার্ডের প্রথম ব্যবহার কার্যক্রম শুরু করার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ-দুবাই পররাষ্ট্র সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা করে বহুমুখী তথ্যের এই কার্ডটিকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা।

জানতে চাইলে ইসির যুগ্ম সচিব ও এনআইডি উইংয়ের পরিচালক (অপারেশন) মো. আবদুল বাতেন বলেন, জাতীয় ভোটার পরিচয়পত্রের আধুনিক সংস্করণ স্মার্টকার্ড। এ কার্ডে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত যত তথ্য থাকা বাঞ্ছনীয় তার সবই আছে। সেদিক থেকে বলা যায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে যে আগ্রহ বা চিন্তা করেছেন তা ইতিবাচক।

তিনি বলেন, বিমানবন্দরে আমাদের বায়োমেট্রিক স্পর্শ করে সব কিছু নিশ্চিত হওয়ার পর নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করতে হয়। যদি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোতে স্মাটকার্ডের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয় তাহলে অন্যান্য দেশের নাগরিকের মতো আমরাও এ সুবিধা পেতে পারি, তাতে নিরাপত্তা তল্লাশিতে সময় বাঁচবে। সমস্যা কম হবে। যোগ করেন এনআইডি উইংয়ের চৌকস এই কর্মকর্তা।

ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার খান মো. নুরুল হুদা রাশিয়ায় এক সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি সেখানে যান। দেশে ফেরার সময় দুবাই এয়ারপোর্টে যাত্রা বিরতি করেন। কয়েক ঘণ্টার যাত্রা বিরতির এক পর্যায়ে সিইসি দেখতে পান কিছু নাগরিক বিশেষ কার্ড স্পর্শ করে সহজেই বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে যাচ্ছেন। নিরাপত্তা রক্ষীদের জেরা কিংবা তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের দরকার লাগছে না। সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্নের এই কারিগর কৌতূহলী হয়ে বিমানের সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে তার অভিব্যক্তি জানালে তারা তাকে তথ্যটি অবহিত করেন।

পরে দুবাইয়ে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসের নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন সিইসি। একই সঙ্গে দুবাই বিমানবন্দরে স্মার্টকার্ড কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশি দূতাবাস প্রধানকে খোঁজ-খবর নিতে নির্দেশনা দেন।

পরে দেশে এসে তার সূদুরপ্রসারী এই চিন্তা কমিশনারদের সঙ্গে শেয়ার করেন। পরে কমিশন ও সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। গত ১৫ অক্টোবর চিঠিও পাঠানো হয়। পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বহুমুখী ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন স্মার্টকার্ড প্রবর্তন করেছে। এই কার্ডে মাইক্রোচিপ, বায়োমেট্রিক এবং মেশিনে পার্টযোগ্য সক্ষমতা সংক্রান্ত তথ্য সংযোজন করা আছে। এই কার্ড এতটাই সুরক্ষিত যাতে কোনো ধরনের প্রতারণা ও জাল করার সুযোগ নেই।

তাই বহুমুখী ব্যবহারের সুবিধা সংবলিত এই কার্ডটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করাই শ্রেয়। বিশেষ করে দুবাই এয়ারপোর্টে বিশেষ অতিথি হিসেবে এই কার্ডটি ব্যবহারে নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হওয়া যেতে পারে। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া ১২টি দেশের নাগরিকরা এ ধরনের কার্ড ব্যবহার করে সহজেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী উতরে যাচ্ছেন। তাই বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ে সমঝোতা হলে বাংলাদেশের ইসি থেকে নাগরিকদের দেওয়া স্মাটকার্ডটির আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যাপ্তি বাড়তে পারে।

কমিশন সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, যেহেতু এই বিধান বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিমানবন্দরে চালু করা গেলে দেশের ভাবমূর্তি আরো বাড়বে। তাই আরো কিছু দিন চিঠির জবাবের জন্য অপেক্ষার পর কোনো সদুত্তর না পেলে পুনরায় তারা তাগিদপত্র পাঠাবেন। কারণ এরই মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠির মেয়াদ এক মাস অতিক্রম করেছে।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, বর্তমান কমিশন যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অবশ্যই ভালো ও ইতিবাচক। কারণ স্মার্টকার্ডের বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে; সেখানে একজন নাগরিকের সব তথ্য সংযুক্ত করা আছে। যদি বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোতে স্মার্টকার্ডকে প্রদর্শন করে সহজেই নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হওয়া যায়, সেটাও রাষ্ট্রের জন্য সম্মানের। যদি এই কার্ডের সহায়তায় নিরাপত্তা কর্মীদের সম্মুখীন না হতে হয়, সেটা আরো ভালো, যোগ করেন সাবেক আমলা ও নির্বাচন কমিশনার।

এ প্রসঙ্গে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, বর্তমান কমিশনের নেওয়া এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানায়। কারণ আমরা যত বেশি পরিমাণে ডিজিটাল বিনির্মাণে অগ্রসর হব তত বেশি স্মাটকার্ডের ব্যবহারকে সহজ করতে হবে। কেননা জটিল, কঠিন ও দুর্লভ দেয়াল বানিয়েতো লাভ নেই, যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও এনজিও বিশেষজ্ঞ।

উল্লেখ্য, স্মার্টকার্ডে তিন স্তরে ২৫টি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংযোজিত রয়েছে। প্রথম স্তরের বৈশিষ্ট্যগুলো খালি চোখে দৃশ্যমান হবে। দ্বিতীয় স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যগুলো দেখার জন্য যন্ত্রের প্রয়োজন হবে। তৃতীয় স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য দেখতে ল্যাবরেটরিতে ফরেনসিক টেস্টের প্রয়োজন হবে। আর ২২ ধরনের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র কাজে লাগবে। আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর পাওয়া, শেয়ার আবেদন ও বিও হিসাব খোলা, ড্রাইভিং লাইসেন্স করা ও নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স করা, পাসপোর্ট করা ও নবায়ন, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, চাকরির আবেদন, বিমা স্কিমে অংশগ্রহণ, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাব খোলা, নির্বাচনে ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংকঋণ, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংযোগ, সরকারি বিভিন্ন ভাতা উত্তোলন, টেলিফোন ও মোবাইলের সংযোগ, সরকারি ভর্তুকি, সাহায্য ও সহায়তা, ই-টিকিটিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, আসামি ও অপরাধী শনাক্তকরণ, বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর পাওয়া ও সিকিউরড ওয়েব লগে ইন করার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লাগবে। তবে বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হতে এ কার্ডের ব্যবহার কার্যকর করা সম্ভব হলে ডিজিটাল বিনির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের যে উদ্যোগ তা অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

"