গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ ৭ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় দুর্ঘটনা তদন্তে তিন কমিটি

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা এলাকার ব্রিকফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি নামের একটি বিল্ডিংয়ের গ্যাসলাইন বিস্ফোরিত হয়ে নারী-শিশুসহ মারা গেছে সাতজন। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে চারজন পুরুষ, দুজন মহিলা ও একজন শিশু রয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আরো নয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের আরো একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মহানগর পুলিশের দক্ষিণের ডিসি মেহেদী হাসানকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। বিস্ফোরণের পর দুটি ভবনের দেয়ালের একাংশ ধসে পড়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহতরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ প্রকৌশল সার্ভিসের জি এম সরওয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছ।

এ বিষয়ে আলাপকালে কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের এমডি প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার বলেন, গ্যাসলাইনে কোনো ত্রুটি আমরা দেখতে পাইনি। তবে পাশে সুয়ারেজ সেফটি ট্যাংকের একটি ঢাকনা খোলা দেখেছি। সেখান থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছি। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

তারা হলেন কক্সবাজারের উখিয়ার রংমিস্ত্রি নুরুল ইসলাম (৩১), পটিয়ার মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়–য়া (৪০), রাঙ্গুনিয়ার কাজল নাথের মেয়ে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা নাথ (১৬), নতুন ব্রিজ এলাকার শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৩০), পাথরঘাটার জুলেখা খানম ফরজানা (৩০) ও তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮)।

বিস্ফোরণের পর দুটি ভবনের নিচতলার দেয়ালের একাংশ উড়ে গিয়ে পাশের রাস্তায় পতিত হলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভবনটি পুরোনো। এর বর্তমান মালিক শুঁটকি ব্যবসায়ী ধর্মপাল বড়–য়া। তিনি ভবনের পাঁচতলার ছাদে একটি কক্ষে থাকতেন। ঘটনার পর থেকে তিনি নিরুদ্দেশ রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। ফোনে যোগাযোগ সংযোগও বন্ধ রেখেছেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিস্ফোরণে আহত হন ভবনটির সম্মুখের রাস্তার বিপরীত দিকের ভবনঘেঁষে পান দোকানি মো. মঞ্জুর হোসেন। তিনি প্রতিবেদনের সংবাদকে বলেন, সকালে আচমকা বিকট আওয়াজে ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি হয়। এ সময় দেয়ালের ভাঙা অংশ তার পান দোকানের ওপর ছিটকে পড়লে তিনি আহত হন। হাতে ব্যথা পান। উপস্থিত পথচারীরা দৌড়ে এসে ভাঙা দেয়ালের অংশ সরিয়ে তাকে উঠিয়ে দাঁড় করান। এ সময় তিনি তার দোকানের পাশে ভবনের সিঁড়ির নিচে দুটি মৃতদেহ, এর পাশে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া রিকশার পাশে এক মহিলা ও শিশুপুত্রের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। আরো একজন রংমিস্ত্রি নুরুল ইসলাম যিনি পাশের ভবনে রঙের কাজ করেন তার লাশও পড়ে থাকতে দেখেন।

জানা গেছে, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের পাঁচতলা ভবনটির গ্যাস সংযোগ স্থানটি ছিল নিচতলায় আবদ্ধ স্থানে। ওই ভবনের নিচতলার অংশবিশেষ উড়ে যায়। সেখানে কেউ নিহত হননি। তবে মারাত্মক আহত হন সন্ধ্যা রানী নামের একজন। তিনি নিচতলায় থাকেন বলে জানা গেছে। তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৬ নম্বর বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তার শরীরের ৩০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে এবং অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে গ্যাস সংযোগের ঘটনাস্থল ভবনটির সম্মুখের রাস্তায় চলাচলকারী পথচারীরাই হতাহত হয়েছেন।

ঘটনাস্থলে বসবাসরত আত্মীয় মারফত সংবাদ পেয়ে বিস্ফোরণের পরপরই ছুটে আসেন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র বড়–য়া। ঘটনাস্থলে তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বিস্ফোরিত ভবনটির পাশের ভবনে থাকেন আমার আত্মীয় ডা. অমিত বড়–য়া। বিকট বিস্ফোরণের পরপরই তিনি আমাকে মোবাইলে রোববার সকাল প্রায় ৯টার দিকে জানালে কয়েক মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের চন্দনপুরার ও আগ্রাবাদের ৫টি ইউনিট নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছি। তিনি জানান, ভবনটির গ্যাস সংযোগের রাইজারটি বিস্ফোরণে ছিটকে দেয়াল ভেঙে পাশের রাস্তায় এসে পড়ে। তিনি সেটিকে উঠিয়ে পরীক্ষা করে প্রাথমিকভাবে দেখতে পান এটি পরিচর্যার অভাবে দীর্ঘদিনের জংধরা বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে গ্যাস লিক হওয়ার সম্ভাবনা তারা খতিয়ে দেখছেন। তিনি নিহত এবং পড়ে থাকা আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সযোগে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন।

গ্যাস সংযোগস্থল বিস্ফোরণের স্থান ভবনটির বিপরীতে অপর ভবনের নিচতলায় টিটু কুমার নাথের ওষুধের ফার্মেসি। পাশেই তার বাসা। বিকট আওয়াজ শুনে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে দেখেন বিস্ফোরণে তার দোকান বিধ্বস্ত ও ল-ভ-। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সকাল প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে তিনি বিকট বিস্ফোরণ ও কম্পনের পর দোকানে এসে তার দোকানের সম্মুখেই লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে দেখতে পান।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জসীমউদ্দিন বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসি। ১৬ জনকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠিয়েছি। সেখানে সাতজন মারা গেছেন। নন্দনকানন, চন্দনপুরা ও আগ্রাবাদ তিন স্টেশনের ১০ গাড়ি উদ্ধারকাজ শুরু করে। গ্যাসলাইন পুরোনো ছিল। লিকেজ, নাশকতা, কেমিক্যাল আছে কি না তদন্ত করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে দুটি আবাসিক ভবনের প্রাচীর ও সড়কের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দোতলা পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছি।

কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মহসীন বলেন, পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় গ্যাসের লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই ভবনের দুটি দেয়াল ধসে পড়ে। এ সময় আহত অবস্থায় বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাদের মধ্যে সাতজনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বিস্ফোরণে ওই ভবনের সীমানাপ্রাচীর ধসে রাস্তার ওপর পড়লে পথচারী ও চলতিপথের যাত্রীরাও আহত হয়েছেন। এ ভবনের পাশাপাশি উল্টোদিকের জসীম বিল্ডিংয়ের নিচতলার দোকানও বিস্ফোরণের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ করেন বলে জানান তিনি।

চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পাথরঘাটায় বিস্ফোরণের পর আহত অবস্থায় প্রথমে ১৬ জনকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহতের মধ্যে চারজন পুরুষ, দুজন নারী ও এক শিশু রয়েছেন। আহতরা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যেও কয়েকজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, চমেক হাসপাতালে বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সবাইকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে চিকিৎসা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক এ নির্দেশ দিয়েছেন বলে তিনি জানান। আহতদের ওষুধসহ সব ধরনের সাপোর্ট সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে ঢাকায় পাঠানো হবে।

এদিকে ঘটনার পর মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি নিহত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান এবং নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দেবেন বলে উল্লেখ করেন। মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, নিহত প্রত্যেকটি পরিবারকে আপাতত দাফন ও যাতায়াত খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরে ওই পরিবারগুলোকে আরো এক লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। যারা আহত হয়েছেন তাদেরও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা হবে। চসিক ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে। আহত প্রত্যেকের ওষুধ চসিকের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার আশ্বাস দেন মেয়র। নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে। এ ছাড়া শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেলের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। গতকাল রোববার নিহত পরিবারদের নওফেলের পক্ষ থেকে সান্ত¦না দিতে এলে তার ছোট ভাই রোরহান উদ্দীন চৌধুরী সালেহীন এ ঘোষণা দেন।

চমেক হাসপাতালে আহত রোগীদের দেখতে এসে সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান বলেন, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশের পক্ষে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে দক্ষিণের ডিসি মেহেদী হাসানকে। অন্য দুজন সদস্য পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা।

বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেন এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে দিনভর চলছে নানা আলোচনা। গ্যাসলাইন বাড়ির দেয়ালের ভতরে থাকলেও বিস্ফোরণের ফলে রাস্তা দিয়ে চলমান মানুষগুলোই প্রাণ হারায়।

"