আবরার হত্যাকাণ্ড

২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট

* ভিন্নমতের বলি হলেন আবরার * ‘নির্ভুল’ চার্জশিটের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর * বিচার হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে : আইনমন্ত্রী

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে জমা দিয়েছে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চার্জশিটে ২৫ বুয়েটছাত্রকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট জমা দেন ডিবির পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, ডেসপাস শাখায় অভিযোগপত্রটি জমা দেওয়া হয়। চার্জশিটে ৬০ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। মামলাসংশ্লিষ্ট ২১টি আলামতও আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এই মামলার আসামি সবাই বুয়েটছাত্র। আর সাক্ষী সবাই বুয়েটের ছাত্র-শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এদিকে গতকাল চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ড মামলার চার্জশিট দাখিলের পর ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার তদন্তে ২৫ জন বুয়েটছাত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। তাদের সবাইকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ১৯ জন এবং এর বাইরে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আরো ছয়জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্তদের মধ্যে ১৬ জন এবং এর বাইরে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক রয়েছে চারজন। এরমধ্যে তিনজন এজাহারভুক্ত ও একজন এজাহারবহির্ভূত। আবরারকে পেটানোয় সরাসরি অংশ নেন ১১ জন। বাকি ১৪ জন হত্যাকান্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন।

মনিরুল আরো বলেন, তদন্তকালে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, রাত ১০টার পর আবরারকে নির্যাতন করা শুরু হয় এবং রাত ২টা ৫০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পেটানোর সময় একাধিকবার বমি করেছিলেন আবরার। বাঁচার আকুতিও জানিয়েছিলেন তিনি। সেসময় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে হয়তো বেঁচে যেতেন। মামলার আলামত হিসেবে নির্যাতনে ব্যবহৃত পাঁচটি ক্রিকেট স্টাম্প, একটি স্কিপিং রোপ, দুটি সিসিটিভির ফুটেজ, পাঁচটি মোবাইল ফোনসেট এবং একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, শিবির সন্দেহ, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বসহ আরো বেশ কয়েকটি কারণে আবরারকে হত্যা করা হয়। পারিপার্শ্বিক বিবেচনা এবং ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা রয়েছে। আবরার ফেসবুকে তার শেষ পোস্টে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। ফেসবুকে মন্তব্যের সূত্র ধরে শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছেন বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে ঘটনায় জড়িত ১২ জনকে শনাক্ত করে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, একক কোনো কারণে নয়, শিবির করে এটি একটি মাত্র কারণ। ওরা এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ছোটখাটো বিষয়ে কেউ একটু দ্বিমত পোষণ করলে কিংবা কেউ এদের বিরুদ্ধে কথা বললে কিংবা সালাম না দেওয়ার কারণেও এই র‌্যাগিংয়ের নামে অত্যাচার চলত। নতুনদের আতঙ্কিত করে রাখার জন্যই তারা এই কাজগুলো করে অভ্যস্ত ছিলেন। আসামিদের অনেকে আদালতে জবানবন্দি না দিলেও পুলিশের কাছে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা উঠে এসেছে।

গত ৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে তার কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যান বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আবরারকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করেন। পরে রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গত ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তদন্তে নেমে এজাহারের ১৬ জনসহ মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদের মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। যাদের সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন।

আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর আন্দোলনে নেমে ১০ দফা দাবি তোলেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। তাদের সেই দাবির সঙ্গে বুয়েট শিক্ষক সমিতি ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও সমর্থন দেন। দাবির মুখে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, আবরার হত্যার আসামিদের সাময়িক বহিষ্কার এবং হলগুলোতে নির্যাতন বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আন্দোলন শিথিল করে ১৪ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিয়ে মাঠের আন্দোলনে ইতি টানলেও হত্যাকারীদের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। গত ১৯ অক্টোবর থেকে বুয়েটের টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও আন্দোলনের কারণে তা এখনো শুরু হয়নি। পরীক্ষা শুরুর জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষ নিজেদের তদন্ত এবং পুলিশের অভিযোগপত্রের জন্য অপেক্ষার কথা জানিয়েছিল।

এজাহারভুক্ত ১৯ আসামি যারা : বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল, সদস্য মুনতাসির আল জেমি, সদস্য মুজাহিদুর রহমান, সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা, সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম, শামীম বিল্লাহ, মাজেদুল ইসলাম, আকাশ হোসেন, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মাহমুদুল জিসান, মোয়াজ আবু হোরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম।

এজাহারের বাইরের ৬ আসামি : বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ এবং মাহামুদ সেতু।

পলাতক চারজন : এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মাহমুদুল জিসান, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম এবং মুজতবা রাফিদ। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

‘স্বীকারোক্তি’ দিয়েছেন আটজন : মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, এ এস এম নাজমুস সাদাত এবং খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর।

মারপিটে সরাসরি জড়িত ১১ জন : মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর।

ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত ১১ জন : মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মনিরুজ্জামান মনির, ইফতি মোশাররফ সকাল, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ এবং মুজতবা রাফিদ।

বিচার হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে : আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল আলোচিত এই মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্র দেওয়ার পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যেকোনো মামলা ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা না গেলে আরো ৪৫ দিন সময় নিতে পারেন আদালত।

ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার বিষয়টি দেখিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, জনগণ চেয়েছে নুসরাত হত্যাকান্ডের বিচার দ্রুত করার জন্য, সেটাও সম্পন্ন করা হয়েছে, এ রকম অনেক বলা যাবে। এখন দায়িত্ব বর্তেছে আবরার হত্যাকান্ডের বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে। মামলাটি পরিচালনায় আগামী সোমবার থেকে ‘প্রসিকিউশন টিম’ কাজ শুরু করছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আবরার হত্যা মামলার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লক্ষ্য ছিল নির্ভুল চার্জশিট দেওয়া, সেটা সম্ভব হয়েছে। শিগগিরই এর বিচারকাজ শুরু হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

"